গিগ ইকোনমি, অর্থাৎ চুক্তিভিত্তিক বা অনিয়মিত কাজের অর্থনৈতিক মডেল, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এর ব্যাপক প্রভাব দেখা যায়। ২০১৮ সালে ফ্রিল্যান্সার বা প্লাটফর্মভিত্তিক কর্মী ছিল খুবই কম, কিন্তু এখন প্রায় আট লাখ ফ্রিল্যান্সার রয়েছে, যাদের অধিকাংশই তরুণ। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশের প্রায় আট লাখ ফ্রিল্যান্সার রয়েছে। কিন্তু তাদের জন্য কোনো আইনি সুরক্ষা, পেনশন বা স্বাস্থ্য বীমা নেই। এ বিশাল কর্মীবাহিনী দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখছে, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে, কিন্তু তারা রাষ্ট্রের সামাজিক সুরক্ষা বলয়ের বাইরে থেকে যাচ্ছে। তাদের কাজকে এখনো শ্রম আইন দ্বারা স্বীকৃতি দেয়া হয়নি, ফলে তাদের অধিকারগুলো বারবার উপেক্ষিত হচ্ছে। তারা কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী না হওয়ায় তাদের চাকরির কোনো নিশ্চয়তা নেই। প্লাটফর্ম যদি তাদের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয়, তবে তারা হঠাৎ করে বেকার হয়ে পড়ে, কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ ছাড়া।
যদি এ সমস্যার সমাধান না হয়, তবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শ্রমবাজার এক অনিশ্চিত পথে পা বাড়াবে। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ তরুণ কর্মজীবী গিগ ইকোনমিতে যুক্ত হবে, যা দেশের শ্রমবাজারকে আরো অস্থিতিশীল করবে। বিশেষ করে ছাত্রসমাজ এ সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। তারা পড়ালেখার পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং বা রাইডশেয়ারিংয়ে যুক্ত হচ্ছে, যা তাদের একাডেমিক জীবনকে প্রভাবিত করছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা রাত জেগে কাজ করে, যা তাদের স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। দীর্ঘমেয়াদি চাকরির নিরাপত্তা, পেনশনের সুযোগ না থাকায় তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে এক গভীর দুশ্চিন্তায় ভোগে। শুধু ছাত্ররাই নয়, এমনকি কিছু শিশুও এ গিগ ইকোনমির সঙ্গে পরোক্ষভাবে যুক্ত হচ্ছে, যেমন ডেলিভারি প্লাটফর্মে তাদের বাবা-মায়ের সঙ্গে কাজ করা।
এছাড়া এ অনিশ্চিত কর্মপরিবেশ সমাজে এক নতুন ধরনের বৈষম্য তৈরি করছে। যারা স্থায়ী চাকরির সুবিধা পাচ্ছেন, তারা নিজেদের নিরাপদ মনে করছেন। কিন্তু যারা গিগ ইকোনমিতে কাজ করছেন, তাদের জীবনটা একটা দোদুল্যমান পেন্ডুলামের মতো। তারা প্রতি মুহূর্তেই কাজের নিশ্চয়তা, আয়ের স্থিতিশীলতা ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে ভুগছেন। এটা কি শুধু অর্থনৈতিক সংকট, নাকি সামাজিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও এর প্রভাব পড়ছে?
বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষ সচেতনতা বাড়ানো এবং এর প্রতিকারে পদক্ষেপ গ্রহণ শুরু করেছে। বিভিন্ন ফ্রিল্যান্সার গ্রুপ এবং প্লাটফর্মভিত্তিক শ্রমিক ইউনিয়নগুলো তাদের অধিকার আদায়ের জন্য একত্র হচ্ছে। তারা সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছে, যাতে গিগ কর্মীদের জন্য একটি আইনি কাঠামো তৈরি করা হয় এবং তাদের সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনা হয়। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে তারা শুধু নিজেদের জন্য নয়, ভবিষ্যতের প্রজন্মের জন্যও একটি নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে চায়। তাদের এ প্রচেষ্টা প্রমাণ করে দায়িত্বশীল নাগরিক এবং পরিবেশ সচেতন মানুষের পাশাপাশি দেশের প্রতিটি জনগণ এ পরিবর্তনের অংশ হতে পারে।
পাঁচ বছর আগে প্লাটফর্মভিত্তিক কর্মী ছিল খুবই কম। এখন প্রায় আট লাখ ফ্রিল্যান্সার রয়েছে, কিন্তু তাদের জন্য কোনো আইনি সুরক্ষা, পেনশন বা স্বাস্থ্য বীমা নেই। ২০৪০ সালের মধ্যে প্রায় ৪৫ শতাংশ তরুণ কর্মজীবী গিগ ইকোনমিতে যুক্ত হবেন, যা দেশের শ্রমবাজারকে অস্থিতিশীল করবে। তাই গিগ কর্মীদের জন্য একটি আইনি কাঠামো তৈরি করা এবং তাদের সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি।
গিগ ইকোনমি একটি বাস্তব ও অপরিহার্য পরিবর্তন, যা আমাদের সমাজে এক নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। কিন্তু এ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এর চ্যালেঞ্জগুলোকেও মোকাবেলা করা জরুরি। সমস্যার গভীরতা উপলব্ধি করে এর সমাধান বের করা আমাদের জন্য এখন সময়ের দাবি। সরকার, প্লাটফর্ম এবং গিগ কর্মীরা একসঙ্গে কাজ করলে একটি স্থিতিশীল এবং ন্যায়সংগত শ্রমবাজার তৈরি করা সম্ভব।
এ সংকট প্রতিরোধে আমাদের একটি দৃঢ় রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। এমন পদক্ষেপ নিতে হবে, যা ভবিষ্যতে আকস্মিক দুর্ঘটনা মোকাবেলায় সাহায্য করবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, কেবল অভিযোগ করে বসে থাকলে সমস্যার সমাধান হবে না। আমাদেরই এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে, একতাবদ্ধ হতে হবে। কারণ এ সমাজ আমাদের, এর দায়িত্ব আমাদেরই।
ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব: সহকারী অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ও গ্লোবাল কনসালট্যান্ট ডিরেক্টর, যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ইমপ্যাক্ট গ্রুপ
দাউদ ইব্রাহিম হাসান: গবেষণা সহকারী, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়










