রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর সংকটময় সময়ে ২০২২ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব নেন। এর আগে তিনি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) মুখ্য অর্থনীতিবিদ এবং অর্থনীতি ও গবেষণা বিভাগ প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন। অর্থনীতিতে অধ্যাপনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব রচেস্টার এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে প্রতিবন্ধকতা, বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নিয়ে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) আয়োজিত এক পডকাস্টে কথা বলেন তিনি। বণিক বার্তার জন্য সাক্ষাৎকারটির সংক্ষেপিত অংশ ভাষান্তর করেছেন আমিরুল আবেদিন
২০২২ সালে ব্যাংক অব কোরিয়ার গভর্নর নিযুক্ত হওয়ার আগে আপনি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) মুখ্য অর্থনীতিবিদ এবং আইএমএফ এশিয়া-প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। ফলে নীতি পরামর্শ দেয়ার অবস্থান থেকে পরামর্শ নেয়ার মতো একটি পদে আপনাকে আসতে হলো। এমনটা আপনার জন্য কেমন ছিল? আর আপনি এখান থেকে কেমন অভিজ্ঞতা পেলেন?
আমাকে বেশ কয়েকটি ভিন্ন ক্যারিয়ারে কাজ করতে হয়েছে। সৌভাগ্যবশত, আমার সবচেয়ে পছন্দের বিষয় অর্থাৎ অর্থনৈতিক গবেষণা ও নীতি পরামর্শের মতো ক্ষেত্রেই আমার ক্যারিয়ার গড়েছে। কাজের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতাটুকু পেয়েছি। এডিবি আর আইএমএফ থেকে আমি যে অভিজ্ঞতা পেয়েছি তা আমাকে মূল্যবান অনেক শিক্ষা দিয়েছে। এর একটি হলো অর্থনৈতিক নীতি বোঝার ক্ষেত্রে বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি রাখতে হবে। এমন দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিক নানা নেটওয়ার্ক গড়তে সহযোগিতা করেছে। বিশেষত আমি যখন বিভিন্ন বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান কিংবা অন্য দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও সহযোগিতামূলক সম্পর্কের চেষ্টা করি, তখন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষত বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও সংকট পর্যবেক্ষণ করার কারণে আর্থিক স্থিতিশীলতা সম্পর্কে আমার উপলব্ধি আরো গভীর হয়েছে। এখন আমি প্রথাগত মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধির দ্বন্দ্ব সম্পর্কিত ভাবনার বাইরে চিন্তা করতে অভ্যস্ত হয়েছি এবং বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আর্থিক স্থিতিশীলতার গুরুত্ব অনুধাবন করি। এ কথা বলার পাশাপাশি আরেকটা বিষয় আমি মনে করি, এখন আমার দায়িত্বের ধরন পাল্টে গেছে। গভর্নর নিযুক্ত হওয়ার আগে আমাকে অধিকাংশ সময় শুধু নীতি পরামর্শ দিতে হতো। এখন এমন এক দায়িত্বে আছি, যেখানে আসলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হয়; অন্তত মুদ্রানীতির ক্ষেত্রে। এ দায়িত্বের গুরুভার অনেক।
আপনার বিভিন্ন বক্তব্যে দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতিতে কিছু সংকট হিসেবে বয়স্ক জনগোষ্ঠী বেড়ে যাওয়া, অভিবাসন এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো বিষয়গুলোর উল্লেখ আছে। আপনি কি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রূপান্তর জরুরি মনে করেন? দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার জন্য কাঠামোগত সক্ষমতা ভূমিকা রাখে?
বিষয়গুলো দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য স্পর্শকাতর। অনেকেই মনে করে আমি এক অদ্ভুত কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নর। কারণ আমি শুধু মুদ্রানীতি নিয়ে কথা বলি না। আমার কথায় বার্ধক্য, শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মতো অনেক বিষয়ের কাঠামোগত সমস্যার উল্লেখ থাকে। এসব বিষয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে কিন্তু অসামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে মূল্য স্থিতিশীলতা। সঠিক মুদ্রানীতি প্রণয়ন করতে হলে আপনাকে অর্থনীতির চালক সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখতে হবে এবং কোন কার্যকারণে সেসব চালকে পরিবর্তন আসে তা নিয়ে বোঝাপড়া থাকতে হবে। যেমন এসব পরিবর্তন চক্রবৃদ্ধি আকারে হচ্ছে নাকি কাঠামোগত কারণে, বোঝা দরকার। দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সম্প্রতি শ্লথগতি দেখা দিয়েছে। এখানে চক্রীয় উপাদানগুলো অর্থনীতিতে প্রভাব রাখছে। পাশাপাশি বার্ধক্য ও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে পরিবর্তনের মতো কাঠামোগত বিষয়ও রয়েছে। এজন্য আপনাকে বুঝতে হবে প্রবৃদ্ধির হার কেন কমছে এবং এ হ্রাস কতটা চক্রীয় কারণে ঘটছে। একই সঙ্গে কাঠামোগত পরিবর্তনের চালিকাশক্তিগুলোকেও ভালোভাবে বুঝতে হবে। এসব ভাবনা আমলে নিয়েই ব্যাংক অব কোরিয়া স্রেফ কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে কাজ করলে হবে না, বরং দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য শীর্ষস্থানীয় থিংকট্যাংক হিসেবেও কাজ করতে হবে।
অন্য দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে তুলনা করলে বা যখন আপনি অন্য কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে আলোচনা করেন, তখন আপনার ভূমিকা কীভাবে মূল্যায়ন করেন? ব্যাংক অব কোরিয়ার পরিসর সংকুচিত নাকি বিস্তৃত?
ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও দেশের অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সবসময় যোগাযোগ থাকে। দেখা যায় তারা রাজস্বনীতি নিয়েও আলাপ করছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতি প্রণয়ন করে, কিন্তু কাঠামোগত বিষয়ে কথা বলা ও যোগাযোগ করাটা স্বাভাবিক বিষয়। দক্ষিণ কোরিয়া এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। আমাদের অর্থনীতিকে পরিচালনার জন্য কাঠামোগত উপাদানগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আমাদের এখানে দ্রুত বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে এবং আমাদের একটি রফতানিনির্ভর অর্থনীতি রয়েছে। আমাদের এমন এক বিশ্ব ব্যবস্থার মধ্যে থাকতে হচ্ছে, যা দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। এগুলো আমলে না নিয়ে আমরা যথাযথ মুদ্রানীতি প্রণয়ন করতে পারি না। এ পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতির মানে হলো, আমাদের কাঠামোগত ইস্যুগুলোর গভীর মনোযোগ দিয়ে অধ্যয়ন করতে হবে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় কি মনে হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা হুমকির মধ্যে আছে?
যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে শৃঙ্খলার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত মূল্য স্থিতিশীলতা অর্জনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা অপরিসীম। ২০২২ সালে আমাদের সুদহার দ্রুত বাড়াতে হয়েছিল। কিন্তু ওই সময় এমন নীতিমালা জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। আমি জনগণকে বোঝাতে পেরেছিলাম, মূল্য স্থিতিশীলতার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ আমাদের দায়িত্বের অংশ। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কঠিন সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবেই নিতে হবে।
স্বাধীনতা এখানে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এ স্বাধীনতা কেমন তা নিয়ে কিছু ভুল ধারণা আছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনেক কাজ রয়েছে। আর্থিক বাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষার পাশাপাশি আমাদের কখনো কখনো সর্বশেষ ঋণদাতার ভূমিকা নিতে হয়। কখনো কখনো দেউলিয়া হয়ে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যা সমাধানের কাজে আমাদের ব্যস্ত থাকতে হয়। এসব কাজের জন্য সরকারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও সার্বিক সহযোগিতা করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একার পক্ষে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব না। মূল্য স্থিতিশীলতা অর্জন কিংবা অন্যান্য অর্থনৈতিক নীতি সমাধানে স্বাধীনতার পাশাপাশি সরকারের সহযোগিতাও জরুরি।
স্পর্শকাতর হলেও একটি প্রশ্ন থাকে। আপনি বলেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত মূল্যস্ফীতি ও সুদহারের মতো ঐতিহ্যগত ধারণার বাইরে গিয়ে আরো কাঠামোগত এবং সামাজিক উপাদানগুলো বিবেচনায় নিয়ে অর্থনীতিকে পরিচালনা। বিষয়টা আপনি কীভাবে অন্যদের বোঝান?
কাজটা সহজ নয়, কারণ কাঠামোগত সমস্যার সহজ কোনো উত্তর নেই। এগুলো বেশ জটিল। যখন আপনি কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধান করতে যান, তখন সবসময় বিজয়ী ও ক্ষতিগ্রস্ত দুই পক্ষ থাকে। যখন আপনি কিছু নীতি সুপারিশ করেন, তখন একেক পক্ষের মূল্যায়ন একেক ধরনের হয়। বিজয়ী পক্ষ, না ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ? সুপারিশটি নির্ভর করে কোন পক্ষের কাঠামোগত সমস্যাকে বিবেচনা করবেন। এছাড়া মানুষের উপলব্ধি পরিবর্তন করা অত্যন্ত কঠিন। যেমন রাস্তার সাধারণ মানুষকে দক্ষিণ কোরিয়ায় সঠিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার কত হওয়া উচিত এমন প্রশ্ন করতে পারেন। অধিকাংশ মানুষই গত কয়েক দশকের উচ্চ প্রবৃদ্ধির সময়কালের ভিত্তিতে বলবেন অন্তত ৩ শতাংশ। অনেকে হয়তো ৪ শতাংশের বেশি বলবেন। কিন্তু বয়স্ক জনগোষ্ঠী বৃদ্ধি ও অন্যান্য পরিবর্তনের কারণে আমাদের সম্ভাব্য জিডিপি প্রবৃদ্ধি এখন প্রায় ২ শতাংশ বা তার নিচে। পরিস্থিতি যে পালটে গেছে, এটা এখন মানুষকে জানানো কঠিন। এজন্যই আমাদের সার্বিক আচরণ ও উপলব্ধির পরিবর্তন আনতে হবে। এ পরিবর্তন আসছে না বলে যোগাযোগ রক্ষা এখন কঠিন। এজন্য আমাদের উচ্চমানের গবেষণাও করতে হবে। তবে গবেষণা করলেই তো হবে না। সেটা যেন সাধারণ মানুষের পড়ার উপযোগী সহজবোধ্য ভাষায় লেখা হয়। যোগাযোগের ক্ষেত্রে এটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কাজটা সহজ নয়।
বিভিন্ন জনমত জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দক্ষিণ কোরিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ছে। প্রতিষ্ঠানের নীতিমালার প্রতি মানুষের সাড়া ইতিবাচক এবং মূল্যায়নও হচ্ছে ব্যাপকভাবে। আপনি যে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা নিয়ে ভাবেন, এর সঙ্গে কি বিষয়টার সম্পর্ক খুঁজে পান? যদি পান তাহলে এটির প্রভাব কী? কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ অভিমুখ পরিবর্তন কেন জরুরি বলে মনে করেন?
অনেকে ভাবেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে প্রথাগত পদ্ধতিতেই যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে। মানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতি প্রণয়নে বেশি মনোযোগ দেবে এবং বাজারে মুদ্রানীতি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না, এমন একটা বার্তা পৌঁছে দেয়া। তবে প্রথাগত যোগাযোগ পদ্ধতিতে বার্তাটা খুব একটা স্পষ্ট থাকে না। আমরা এমন প্রথাগত ভাবনার বাইরে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছি। কিন্তু সফলতা পেতে আরো সময় লাগতে পারে।










