জলাবদ্ধতা চট্টগ্রাম নগরবাসীর জন্য এখন এক নিত্য আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্ষা আসার আগেই সামান্য বৃষ্টিতে নগরবাসী জলাবদ্ধতায় যে দুর্যোগ অবস্থা অতিক্রম করেছে তা আগামী বর্ষার জন্য বিশাল এক হুমকি। বাংলাদেশে পাহাড়, নদী, সমুদ্রের এক অনন্য বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শহর বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জনগণের সচেতনতার অভাব ও পর্যাপ্ত সমন্বয়ের ঘাটতি থাকায় চট্টগ্রামের নগর পরিবেশ নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন। পানি নিষ্কাশনে চট্টগ্রাম শহরে প্রাকৃতিকভাবে একটি চমৎকার ব্যবস্থা থাকার পরও এখানে জলাবদ্ধতার সমস্যা দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে।
গত ২৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চট্টগ্রাম নগরীর সাম্প্রতিক জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগের কারণে নগরবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন।
গত ২৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম নগরীতে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত মাত্র ১০ মিলিমিটার বৃষ্টিতে পুরো নগরীতে বিপর্যয় নেমে আসে। এ স্বল্প পরিমাণ বৃষ্টিতে নগরীর প্রবর্তক মোড়, কাতালগঞ্জ, রহমতগঞ্জ, মুরাদপুর এলাকায় বুকসমান পানি জমে ২-৩ ঘণ্টার জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এর আগের দিন ২৭ এপ্রিল ২৪ ঘণ্টায় ১৩ মিলিমিটার বৃষ্টিতেও নগরীর নিম্নাঞ্চল হাঁটু পানিতে তলিয়ে যায়। বন্দরনগরী চট্টগ্রামে মূলত জোয়ারজনিত ও বর্ষাকালীন—এ দুই ধরনের জলাবদ্ধতা লক্ষ করা যায়, তবে মূলত বর্ষাকালীন জলাবদ্ধতা সমস্যা প্রকট। চট্টগ্রামে বর্ষার সময় ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টার বৃষ্টিতে মহানগরীর প্রায় ৪০-৫০ শতাংশ এলাকা জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।
আগের এক গবেষণায় (আকতার ও অন্যান্য, ২০২২) দেখা যায়, চট্টগ্রামে যদি জলাবদ্ধতায় পানির গভীরতা এক মিটার হয়, তবে শহরের ১৫ দশমিক ৫০ শতাংশ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ২৫ শতাংশ বসতবাড়িতে জলাবদ্ধতার পানি প্রবেশ করে। বিদ্যমান খাল ও নালা পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রশস্ত ও পরিচ্ছন্ন না হওয়ায় জলাবদ্ধতা প্রকট হচ্ছে। তবে এ মৌসুমের প্রথম জলাবদ্ধতার কয়েকটি প্রধান কারণ অল্প সময়ে অস্বাভাবিক বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা প্রকল্পের কাজের জন্য কিছু নালা ও খালে বাঁধ দেয়া, পুকুর জলাশয় ভরাট, প্লাস্টিকসহ নানাবিধ বর্জ্যে পানি প্রবাহে বাধা এবং জোয়ারের প্রভাব ও পলি জমা হওয়া ইত্যাদি। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে নগরীতে কয়েক ঘণ্টায় রেকর্ড পরিমাণ ১৩৯ মিমি বৃষ্টি হয়। নালা-নর্দমা ভরাট ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প চলমান থাকায় এবং পুকুর জলাশয় ক্রমাগত কমায় হঠাৎ বৃষ্টির পানি নগরী ধারণ করতে অক্ষম। ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নগরীর প্রবর্তক, মুরাদপুর, চকবাজার, জামারখান, সাবএরিয়া, কাতালগঞ্জসহ বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল তীব্র জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এ জলাবদ্ধতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ চলমান জলাবদ্ধতা প্রকল্পের কাজের জন্য বিভিন্ন খালে বাঁধ দেয়া। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের অধীন উন্নয়ন কাজে নগরীর হিজড়া ও জামালখান খালে প্রায় ৩০টি বাঁধ দেয়া হয়। মূলত এ দুই খালসংলগ্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার প্রকোপ বেশি ছিল। এছাড়া বহদ্দারহাট, মুরাদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় এখনো বেশকিছু খালের কাজ চলমান রয়েছে। সে কারণে বাঁধ দিতে হয়েছে।
চলতি মৌসুমে বৃষ্টিপাতের কথা চিন্তা করে আগে থেকে উদ্যোগ নিলে জলাবদ্ধতার তীব্রতা কিছুটা হলেও কমানো যেত। চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা প্রকল্পের কাজ ৯৫ শতাংশ শেষ হলেও ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় হিজড়া খালের অগ্রগতি ৬০ শতাংশ এবং শুধু এ খালের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ২০টি বাঁধ দেয়া হয়েছে। এসব বাঁধই চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতাকে ভয়াবহ করে তুলেছে সাম্প্রতিক সময়ে। চট্টগ্রাম শহরে বিভিন্ন উৎস থেকে দৈনিক প্রায় ২৫০০-৩০০০ টন বর্জ্য সৃষ্টি হয়। কিন্তু প্রায় ৭৫ লাখ নগরবাসীর বর্জ্য অপসারণে প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে দৈনিক প্রায় ১০০০-১২০০ টন বর্জ্য রাস্তা, নালা, নর্দমা, খালে বিচ্ছিন্নভাবে পড়ে থাকে এবং পরে এসব বর্জ্য নালা ও খালে পড়ে ড্রেনেজ ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতা এবং শহরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম শহরের শত শত টন বিভিন্ন প্লাস্টিক বর্জ্যও প্রতিনিয়ত জমা হচ্ছে কর্ণফুলী নদীতে, ফলে নদীদূষণসহ ভরাট হচ্ছে তলদেশ। যেকোনো নগরের প্রাকৃতিক ও মানবিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পুকুর ও জলাশয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে চট্টগ্রাম শহরের বহু বিখ্যাত পুকুর-দিঘি-জলাশয়-ডোবা ইত্যাদি ভরাট হয়ে যাচ্ছে। নগরীর পুকুর জলাশয়গুলো পানি চক্রের একটি ক্ষুদ্রতম অংশ এবং জলাশয়গুলো তাপমাত্রা কমাতে ও বৃষ্টির অতিরিক্ত পানি ধারণ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের এমফিল গবেষণায় মোরশেদ ও তৈয়ব চৌধুরী (২০১৮) নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে ১ হাজার ৩৫২টি জলাশয় চিহ্নিত করেন। তাদের গবেষণায় দেখা যায়, চট্টগ্রামে প্রতি বছর ১০ শতাংশ হারে পুকুর ও জলাশয় কমছে। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী সব পুকুর ও জলাশয় ভরাট করে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের ফলে নগরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিপর্যস্ত হচ্ছে এবং অল্প সময়ের বৃষ্টিতে পর্যাপ্ত জলাশয়ের অভাবে নগরী তলিয়ে যাচ্ছে। জলাবদ্ধতার কারণে চট্টগ্রাম শহরের ওপর নানা নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। জলাবদ্ধতায় ব্যাহত হয় নাগরিক স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। ভেঙে পড়ে পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিঘ্নিত হয় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাভাবিক গতি। নষ্ট হয় বিভিন্ন অবকাঠামো এবং সর্বোপরি ময়লা, আবর্জনা শহরের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সৌন্দর্যহানি ঘটায়। জলাবদ্ধতার সময়ে নালা, খাল, সড়কের পানি এবং স্রোত একাকার হয়ে নালা ও খালে পড়ে মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে। চট্টগ্রাম মহানগরীর সাম্প্রতিক অন্যতম একটি সমস্যা হয়ে দেখা দিচ্ছে নালা ও খালে পড়ে মৃত্যু। এ বিষয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় দৃষ্টিপাত না দেয়ায় এ সমস্যা একটি নিযমিত দুর্ঘটনায় পরিণত হয়েছে। চট্টগ্রাম শহরে ১৫ বছর ধরে ক্রমাগতভাবে খাল ও নালা দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, ভবনের নির্মাণসামগ্রী ও পাইলিংয়ের মাটি খালে নিক্ষেপ, খালের ওপর নির্মিত কালভার্টের ত্রুটিপূর্ণ নকশা, নিয়মিতভাবে খাল ও নালা পরিষ্কারের অভাব, নালা-নর্দমায় পলিথিন ও প্লাস্টিকের বিভিন্ন সামগ্রী নিক্ষেপ, পাহাড়ি বালিতে খাল-নালা ভরাট হয়ে যাওয়া, গৃহস্থালি এবং দোকানপাটের আবর্জনা খালে নিক্ষেপ, জলাশয় ও পুকুর ভরাট সর্বোপরি নিয়মনীতি না মেনে অপরিকল্পিতভাবে ভবন নির্মাণের ফলে পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, এ আধুনিক-সভ্য সমাজ এবং সময়ে নালায় ও খালে পড়ে হতাহত হওয়া চট্টগ্রামে একটি নিয়মিত দুর্ঘটনায় পরিণত হয়েছে। গত ৭ এপ্রিল চট্টগ্রাম নগরীর বাকলিয়া থানার অন্তর্গত ভেড়া মার্কেট এলাকার চাক্তাই খালে পড়ে রাকিব নামে ১০ বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা ও রিপোর্টে দেখা যায়, ২০১৭-২৬-এর এপ্রিল পর্যন্ত চট্টগ্রাম নগরীতে নালায় ও খালে পড়ে এ ১৭ জন মারা যান।
সামগ্রিক দিক বিবেচনায় চট্টগ্রাম মহানগরীর আলোচিত এ জলাবদ্ধতা সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে কিছু উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে—বিদ্যমান খাল ও নালার ওপর প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিতকরণ ও অপসারণ; সময়োপযোগী আধুনিক বাস্তবসম্মত ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন; সিটি করপোরেশন, সিডিএ, ওয়াসা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন সেবা সংস্থা একটি সমন্বয় কমিটির মাধ্যমে কাজ করা; দখলকৃত নালা-খাল উদ্ধার করে চট্টগ্রাম শহরের প্রকৃত ড্রেনেজ ডেটাবেজ প্রণয়ন করা; পানির প্রাকৃতিক জলাধার-নগরীর পুকুর জলাশয় ও নিচু জমিগুলো রক্ষা করতে হবে; বর্তমান সরকারের উদ্যোগে সমগ্র দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-খাল ও জলাশয় খনন এবং পুনঃখননের উদ্যোগকে যথাযথ বাস্তবায়ন করা; জোয়ারজনিত জলাবদ্ধতা নিরসনে খালগুলোর মুখে যথাযথ স্লুইসগেট স্থাপন করা জরুরি। বিশেষত খালের মধ্যে বর্জ্য নিক্ষেপ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সর্বোপরি নগরের জলাধারগুলো সংরক্ষণ এবং পাহাড় কাটা রোধ করে জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধিই হতে পারে এ সমস্যা থেকে মুক্তির অন্যতম পথ। এজন্য জলাবদ্ধতা নিরসনে সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক একতা প্রয়োজন।
ড. মো. ইকবাল সরোয়ার: অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়










