বাংলাদেশের বনজ সম্পদ উন্নয়নের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচিত হয়েছিল ১৯৫৯ সালের ৩ অক্টোবর। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার অধ্যাদেশ নং ৬৭ দ্বারা পূর্ব পাকিস্তান বন শিল্প উন্নয়ন করপোরেশন প্রতিষ্ঠা করে। স্বাধীনতার সোনালি সূর্যোদয়ের পর ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির ৪৮ নং আদেশের মাধ্যমে এর নামকরণ হয় বাংলাদেশ বন শিল্প উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফআইডিসি)। বিএফআইডিসি বাংলাদেশ সরকারের একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, যেটি বাংলাদেশের বনাঞ্চলের বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনা, কাঠ সংগ্রহ ও নির্দিষ্ট স্থানে বনায়নের কাজ করে থাকে। কাপ্তাইয়ের কাঠের লগ আহরণের মাধ্যমে ১৯৬০-৬১ সালে প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা শুরু করে।
এ প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য বনভূমি ও বিএফআইডিসির রাবার বাগান থেকে কাঠ, রাবার, কাঠজাতীয় পণ্য ও অন্যান্য বনজ দ্রব্য আহরণ করে সেসব পণ্যকে মানসম্পন্ন পণ্যে পরিণত করা। তৎকালীন প্রযুক্তি সুবিধা ও সম্পদ ব্যবহার করে এখানে প্রক্রিয়াকরণ প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে তাল মিলিয়ে আধুনিক চাহিদা পূরণে সময়ের সঙ্গে এসব প্রযুক্তি ও সুযোগ-সুবিধা পরিবর্তন করা একান্ত প্রয়োজন। মূলত প্রতিষ্ঠার ৬৫ বছর পরও প্রতিষ্ঠানটি তার প্রকৃত সম্ভাবনাকে পূর্ণভাবে কাজে লাগাতে পারেনি; যদিও বাংলাদেশের বনাঞ্চলের বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনা, কাঠ সংগ্রহ ও বনায়নের ক্ষেত্রে এর ভূমিকা অপরিহার্য। একটি প্রতিষ্ঠানকে তখনই একটি টেকসই প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সম্ভব, যখন সেখানে বিশ্বমানের প্রযুক্তি ও গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব। তবে এর আগে এখানে খুব কমই পরিবর্তন হয়েছে অথবা পরিবর্তন হলেও তা চোখে পড়ার মতো নয়। স্বাভাবিকভাবেই অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও করপোরেশনটি আজও আধুনিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়নি।
অতএব বিএফআইডিসির একটি ‘উপযুক্ত উন্নয়ন পরিকল্পনা ও এর যথাযথ ব্যবস্থাপনা’ প্রয়োজন। যার লক্ষ্য হবে বিএফআইডিসিকে টেকসই বনজ সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা, উচ্চমূল্যের আসবাব তৈরি ও দক্ষ রাবার ল্যাটেক্স ব্যবহারের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করা। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা। একজন ফরেস্ট্রি স্পেশালিস্ট হিসেবে এ প্রসঙ্গে নিজের একান্ত পরিকল্পনা তুলে ধরতে চাই—
- প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান অবস্থানের মূল্যায়ন
- আসবাব তৈরি ও বাজারজাতের টেকসই নীতিমালা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন
- রাবার ল্যাটেক্স সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ বাজারজাতে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পরিকল্পনা
- প্রতিষ্ঠানটির টেকসইত্ব ও পরিবেশগত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে কর্মপন্থা নির্ধারণ
- দক্ষ জনবল তৈরি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি
প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান অবস্থানের মূল্যায়ন
প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তন ঘটানোর মূল কাজ সেই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে কী অবস্থায় রয়েছে সেটা সর্বপ্রথম যাচাই করা। প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান অবস্থার নিরূপণের ওপর নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানটির উন্নতিকল্পে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ। যেহেতু বিএফআইডিসি বন শিল্প উন্নয়নে একটি সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠান। তাই এ মূল্যায়নটাই প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠি।
সম্পদ মূল্যায়ন: বিদ্যমান বনজ সম্পদের একটি বিস্তৃত জরিপ পরিচালনা করা দরকার, যার মধ্যে আসবাব তৈরির জন্য উপযুক্ত কাঠের প্রজাতি এবং ল্যাটেক্স উৎপাদনের জন্য রাবার গাছ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যমান সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়।
অবকাঠামো নিরীক্ষা: কাঠ ও রাবার ল্যাটেক্স প্রক্রিয়াকরণের জন্য ব্যবহৃত বর্তমান সুযোগ-সুবিধা, যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি মূল্যায়ন করা; বর্তমান অবকাঠামোর অবস্থা নিরীক্ষার মাধ্যমে বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা আরো আধুনিকায়নের সুযোগ সৃষ্টি করা।
মানবসম্পদ: বন ব্যবস্থাপনা, কাঠ প্রক্রিয়াকরণ, আসবাব নকশা ও রাবার ল্যাটেক্স প্রক্রিয়াকরণে কর্মীদের দক্ষতা ও দক্ষতা মূল্যায়ন করা; যার মাধ্যমে এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত সব পর্যায়ের অংশীজন সুবিধা পেতে পারে।
বাজার বিশ্লেষণ: আসবাব ও রাবার পণ্যের বর্তমান বাজার চাহিদা পর্যালোচনা করা, বিশেষ করে সরকারের আর্থিক দিকটা সর্বোচ্চ বিবেচনা করা। এ বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক বিষয়সহ বাজার সম্প্রসারণ সম্ভব হবে।
পরিবেশগত প্রভাব: বিএফআইডিসির কার্যক্রমের বর্তমান পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করে টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করা ও সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
আসবাবপত্র তৈরি ও বাজারজাতের ক্ষেত্রে করেপারেশনের ভূমিকা যেমন হওয়া উচিত
বিএফআইডিসি বাংলাদেশের একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান, যা সরাসরি আসবাব তৈরি ও বাজারজাতের সঙ্গে জড়িত। নিত্যনতুন প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে আমাদের দেশের আসবাবকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে বিএফআইডিসির এ সেকশনের উন্নয়ন করা জরুরি। তাই প্রতিষ্ঠানের এ অংশটির পরিবর্তন আনতে পারলে প্রতিষ্ঠানটি আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারবে। তাই উন্নয়নকল্পে এ পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।
নকশা উদ্ভাবন: জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উদ্ভাবনী ও বিপণনযোগ্য আসবাব নকশা তৈরির জন্য গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ করার পাশাপাশি গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য নতুন ক্ষেত্র তৈরির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি যুগোপযোগী করে তোলা।
প্রযুক্তির উন্নয়ন: বর্তমান বিশ্বে টিকে থাকার জন্য প্রযুক্তি একটি বড় হাতিয়ার। যে প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ যত বেশি, সেই প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি তত লক্ষণীয়। দক্ষতা ও পণ্যের মান উন্নত করতে কাঠ-কাটা, প্রসেসিং এবং সংরক্ষণের জন্য উন্নত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে প্রক্রিয়াকরণ সুবিধা আধুনিকীকরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করা আশু প্রয়োজন।
নতুন উৎপাদন লাইন স্থাপন: নতুন উৎপাদন লাইন সৃষ্টি করতে না পারলে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাবে। তাই বর্তমান বিশ্বে তাল মিলিয়ে নতুন সম্পদ ও পণ্য ব্যবহারের জন্য নতুন উৎপাদন সুবিধা স্থাপন করা একান্ত জরুরি।
দক্ষতা উন্নয়ন: দক্ষ মানবসম্পদ প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়ক। একটি প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক উন্নতি অনেকাংশেই নির্ভর করে সেই প্রতিষ্ঠানের দক্ষ জনবলের ওপর। তাই আধুনিক আসবাব তৈরির কৌশল, নকশা ও মান নিয়ন্ত্রণে কর্মীদের জন্য আধুনিক ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা আবশ্যক হওয়া উচিত।
বাজার সম্প্রসারণ: উন্নত বিশ্বে তাল মিলিয়ে এবং দেশের অভ্যন্তরে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পণ্য তৈরির মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি ক্ষেত্রেই নতুন বাজার সম্প্রসারণের সুযোগগুলো অন্বেষণ করা এখন সময়ের চাহিদা বলে প্রতীয়মান।
ব্র্যান্ডিং ও বিপণন: বিএফআইডিসিকে একটি ব্যান্ড হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটির আসবাব ও অন্যান্য পণ্যের জন্য একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড-টু-আইডেন্টিটি তৈরি করা, যা তাদের গুণমান, স্থায়িত্ব ও কারুশিল্প তুলে ধরতে সক্ষম হয়।
রাবার ল্যাটেক্স সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ বাজারজাতের ক্ষেত্রে বিএফআইডিসি প্রধান চালিকাশক্তি
রাবার ল্যাটেক্স বন শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস খাত। এ ল্যাটেক্স সংগ্রহ ও বাজারজাতের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করা সম্ভব। বাংলাদেশে বিএফআইডিসি একমাত্র প্রতিষ্ঠান যারা রাবার ল্যাটেক্স সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ ও বাজারজাতের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এ খাতকে লাভজনক করার জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করা এখন অতীব জরুরি।
ল্যাটেক্স সংগ্রহ: রাবারের ল্যাটেক্স সংগ্রহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ বন শিল্প উন্নয়ন করপোরেশন। এ প্রতিষ্ঠানের অন্যতম কাজ রাবার গাছের পরিচর্যা নিশ্চিত করার সঙ্গে সঙ্গে ফলন ও গুণমান বৃদ্ধির জন্য ল্যাটেক্স সংগ্রহের কৌশল এবং সরঞ্জাম উন্নতকরণের দিকে মনোযোগী হওয়া।
প্রক্রিয়াকরণ সুবিধা: এ ল্যাটেক্স প্রক্রিয়াকরণ একটি অন্যতম বিষয়, যার ওপর করপোরেশনের আর্থিক দিক নির্ভর করে। ল্যাটেক্স সংগ্রহের গ্লাভস, রাবার শিট ও আঠালো জাতীয় উচ্চমূল্যেরসহ বিস্তৃত পরিসরের পণ্য উৎপাদনের জন্য ল্যাটেক্স প্রক্রিয়াকরণ সুবিধাগুলো উন্নত করা একান্ত প্রয়োজন।
পণ্য উন্নয়ন: উদীয়মান বাজারের চাহিদা পূরণ করে নতুন রাবার পণ্য তৈরি করতে গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ আরো বৃদ্ধি করা।
রফতানি কৌশল: প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম কৌশল হওয়া উচিত বিদেশে পণ্য রফতানির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজার তৈরি। এ লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানের তৈরীকৃত পণ্যগুলো যেন আন্তর্জাতিক মান ও সার্টিফিকেশন পূরণ করে এবং সেগুলোর গুণণত মান বজায় রেখে রফতানি করা যায় তেমন সক্ষমতা অর্জন করা।
টেকসই বাগান তৈরির অনুশীলন: পরিবেশগত সুবিধা বৃদ্ধির জন্য আন্তঃফসল ও জৈব চাষের মতো রাবার বাগানগুলোও যাতে টেকসই হয়, সেইদিকে নজর প্রদানের এখনই সময়।
বিএফআইডিসি হোক পরিবেশ উন্নয়নের অন্যতম হাতিয়ার। পরিবেশগত উন্নয়ন আজ একটি বড় ইস্যু। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের পরিবেশ রক্ষা করে বন শিল্প উন্নয়নের জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিএফআইডিসিকে একটি সফল প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে চাইলে পরিবেশগত বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করাও অত্যন্ত জরুরি।
পুনর্বনায়ন কর্মসূচি: পরিবেশগত উন্নয়ন একটি দেশের জীববৈচিত্র্য উন্নয়নের অন্যতম হাতিয়ার। বিএফআইডিসির বাগানগুলো আরো সম্প্রসারণ এবং নতুন বাগান তৈরির মাধ্যমে কাঠ ও রাবারের নিরন্তর সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য পুনর্বনায়ন কর্মসূচি বিকাশ ও বাস্তবায়ন করা খুবই জরুরি।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রাবার প্রক্রিয়াকরণ সুবিধাগুলোয় বর্জ্য ব্যবহার হ্রাস কৌশল বাস্তবায়ন করা এবং অন্যান্য শিল্পে উপজাত পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।
সার্টিফিকেশন ও মান: আন্তর্জাতিকভাবে পণ্যগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রাসঙ্গিক পরিবেশগত সার্টিফিকেশন (যেমন, কাঠের জন্য এফএসসি, আইএসও মান) অর্জন করা এখন সময়ের চাওয়া।
নিজস্ব জনবল ও অংশীদারদের সেতুবন্ধ হোক বিএফআইডিসি
প্রতিষ্ঠানভিত্তিক দক্ষ জনবল তৈরির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি উন্নয়ন সম্ভব। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত ও তথ্যভিত্তিক গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা এখন খুবই প্রয়োজন। উন্নত বিশ্বে তাল মিলিয়ে বিএফআইডিসির দক্ষ জনবল তৈরি খুবই প্রয়োজন। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের উন্নতি নির্ভর করে তার নিজস্ব জনবলের দক্ষতা, স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে অংশীদারত্ব ও সহযোগিতার মনোভাবের ওপর। এ বিষয়ে আমার পর্যবেক্ষণ হলো—
একাডেমিক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান: পণ্য উন্নয়ন ও টেকসই অনুশীলনের মাধ্যমে নতুন উদ্ভাবনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করা, যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি তার নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও নিজের দক্ষতা বজায় রাখবে।
বেসরকারি খাত: প্রযুক্তি স্থানান্তর, বাজার অ্যাকসেস ও অবকাঠামোতে বিনিয়োগের জন্য বেসরকারি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্বমূলক সম্পর্ক তৈরি করা, যেন প্রতিষ্ঠানটির স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়।
আন্তর্জাতিক সংস্থা: বন সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সর্বোত্তম অনুশীলনের ওপর তহবিল, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও জ্ঞান বিনিময়ের জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে জড়িত থাকা একান্ত জরুরি। কেননা বর্তমান বিশ্বে সৃজনশীলতাকে প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে নিজেদের সহযোগিতামূলক সম্পর্ক বজায় রাখা।
কর্মক্ষমতা পরিমাপ: প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের রাবার বাগান তৈরি এবং ল্যাটেক্স সংগ্রহের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান। এ পণ্য উৎপাদনের পরিমাণ, বাজার সম্প্রসারণ ও স্থায়িত্বের মতো ক্ষেত্রে অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য মূল কর্মক্ষমতা সূচক (কেপিআই) স্থাপন করা একান্ত জরুরি। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা আরো বৃদ্ধি পাবে মনে হয়।
নিয়মিত নিরীক্ষা: প্রথাগত নিরীক্ষা নয়, প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানের উন্নতিকেন্দ্রিক নিরীক্ষা। কেননা নিয়মিত স্বচ্ছ নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের উন্নতি সম্ভব। নিয়মিত অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত নিরীক্ষা পরিচালনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়ানো যায়। পরিবর্তিত বাজার পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে নিয়মিত উন্নয়ন পরিকল্পনা পর্যালোচনা ও হালনাগাদ করে নিরন্তর উন্নতির সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন।
বিএফআইডিসি হোক আর্থিক পরিকল্পনা গ্রহণের আদর্শ
যে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনা যত ভালো সেই প্রতিষ্ঠানের উন্নতি তত বেশি ত্বরান্বিত হয়। আর্থিক সচ্ছতা, পরিকল্পিত আর্থিক ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক উন্নয়নের চাবিকাঠি। তাই বিএফআইডিসিকে আর্থিকভাবে পরিকল্পিত ও স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
বাজেট বরাদ্দ: প্রতিটি খাতে পরিকল্পিত বাজেট প্রণয়নের মাধ্যমে প্রতিটি পরিকল্পনার জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট নির্ধারণ করা এবং সরকারি সহায়তা, বেসরকারি বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক অনুদানের মাধ্যমে তহবিল নিশ্চিত করা। প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ও সময়োপোযোগী পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে একটি স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা।
লাভ-ক্ষতি বিশ্লেষণ: সেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে, তা নিয়মিতভাবে আর্থিক সম্ভাব্যতা মূল্যায়ন করা জরুরি এবং অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব নিশ্চিতে সেই অনুযায়ী কৌশলগুলো সমন্বয় করা একান্ত প্রয়োজন।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ বন শিল্প উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফআইডিসি) শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি আমাদের দেশের বনজ সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি কেন্দ্রবিন্দু। রাবার সংগ্রহ ও বাজারজাত, উচ্চমানের আসবাব তৈরি ও কাঠের বৈজ্ঞানিক ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে এ প্রতিষ্ঠান বছরে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু এ লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ ও সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা। বিএফআইডিসিকে একটি আধুনিক, লাভজনক ও পরিবেশবান্ধব প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের মাধ্যমে আমরা শুধু অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিই অর্জন করব না, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের সুনাম বৃদ্ধিতেও অবদান রাখব। তাই সময় এসেছে বিএফআইডিসিকে শুধু একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান হিসেবে না দেখে, একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষম একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও টেকসই প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার। এ স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও দৃঢ় অঙ্গীকার প্রয়োজন। বনের সবুজ ছায়ায় বেড়ে ওঠা এ প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠুক আমাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নতুন দিগন্ত। এ প্রত্যাশায় আমরা অপেক্ষায় থাকব সেই সুদিনের, যখন বিএফআইডিসি বিশ্বমানের একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত হবে।
ড. মো. নজরুল ইসলাম: উপ-উপাচার্য, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা ও অধ্যাপক, ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়










