২০১৬ সালের মধ্যে এটি চালু করার কথা থাকলেও এক যুগের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে অথচ প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। এক যুগে ওই রুটের যাত্রীদের ভোগান্তি আর সুগম যাতায়াতের অপেক্ষাই বেড়েছে এমন নয়। ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা। প্রকল্পটির আর ৩ শতাংশ কাজ যখন বাকি তখন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ প্রকল্প বাতিল করে দেয়াই ভালো। বণিক বার্তার প্রতিবেদন বলছে, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে গঠিত দুটি তদন্ত কমিটি এবং বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের রিভিউ কমিটি এ সুপারিশ দিয়েছে। তবে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) ভিন্ন কথা জানিয়েছে। তারা বলছে, মাত্র ৩ শতাংশ কাজ বাকি থাকার আগে প্রকল্প বাতিল করলে অর্থের অপচয় হবে। আপাতত এ সিদ্ধান্ত মন্ত্রিসভার ওপর ন্যস্ত হয়েছে। এমন জটিল পরিস্থিতিতে এ প্রকল্পের ব্যর্থতার মূল কারণ বিশ্লেষণ, প্রকল্পটির বর্তমান প্রয়োজনীয়তা পুনর্মূল্যায়ন এবং সামনে এটিকে যথোপযুক্ত ব্যবহারের বিষয়ে স্বচ্ছ আলোচনা-পর্যালোচনা জরুরি হয়ে উঠেছে।

বিআরটি প্রকল্প একক কারণে ব্যর্থতার পথে এগোয়নি। এটি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, নকশাগত ত্রুটি শনাক্তের পরও প্রাথমিক পর্যায়েই সংশোধনের উদ্যোগ না নেয়া, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং জবাবদিহির অভাবের দীর্ঘ যৌগিক ফল। প্রকল্পটির নকশাগত ত্রুটি থেকে সমস্যার সূত্রপাত। বুয়েটের রিভিউ কমিটির প্রতিবেদন বলছে, ২০ কিলোমিটার করিডোরের অনেক অংশ বিশেষত শিল্পাঞ্চল বিআরটির উপযুক্ত ছিল না। বিআরটি পর্যাপ্ত প্রশস্ত নয়, সার্ভিস রোড আর ফুটপাতও অনেক জায়গায় নেই। মূল পরিকল্পনায় ডেডিকেটেড বাস লেনের কথা থাকলেও পরে ব্যাক্তিগত গাড়ির লেন যুক্ত করা হয়। এভাবেই প্রকল্পের পরিধি, ব্যয় ও প্রকৌশলগত জটিলতা একসঙ্গে বেড়ে যায়। প্রকল্পের পরিকল্পনার সঙ্গে যারা যুক্ত ছিলেন তারা নগর বাস্তবতার সঙ্গে সংগতি রেখে নকশা তৈরি করতে পারেননি।

এদিকে প্রকল্পটি পরিষেবাকেন্দ্রিক না হয়ে অবকাঠামোকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছিল। ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ হয়েছে ফ্লাইওভার, র‍্যাম্প ও স্টেশন তৈরিতে। অথচ এখনো বাস কেনা হয়নি। যে সেবা দেয়ার জন্য এ অবকাঠামো সেটির চিন্তাই সবার শেষে রাখা হয়েছে। এটিই দেশের উন্নয়ন প্রকল্পের পুরনো সমস্যা। দৃশ্যমান অবকাঠামো নির্মাণকেই গুরুত্ব দেয়া হয়, সেবার কার্যকারিতাকে নয়। এদিকে প্রকল্পে জবাবদিহির শূন্যতাও গোটা প্রক্রিয়াকে অরক্ষিত রেখেছে। এ প্রকল্পের সঙ্গে দেশী-বিদেশী পরামর্শক প্রতিষ্ঠান থাকার পরও নকশার ত্রুটি শুরুতে কেন ধরা পড়েনি এবং সংশোধন হয়নি—এসব প্রশ্নের উত্তর অস্পষ্ট। অথচ পরিচালনা মডেল তৈরির দায়িত্বে থাকা বুয়েট ও ভারতের সিইপিটি ভবিষ্যতে ব্যর্থতার শঙ্কায় প্রকল্প ছেড়ে চলে যায়। এটি এ প্রকল্পের অভ্যন্তরীণ সংকটের অস্বস্তিকর স্বীকারোক্তি। এসব কারণে সাধারণ মানুষ এ প্রকল্পকে অব্যবস্থাপনার প্রতীক হিসেবেই চিনেছে।

বিআরটির মতো গণপরিবহন ব্যবস্থা রাজধানীর জন্য অপরিহার্য বলেই এটিকে বাতিল করার সিদ্ধান্ত ঠিক হবে না। কারণ এর মাধ্যমে মেট্রোর চেয়ে কম ব্যয়ে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক যাত্রীদের উন্নত সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব। রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থা বরাবরই দুর্বল। বাসভিত্তিক পরিবহন অনিয়মিত ও অনিরাপদ। এজন্য বাধ্য হয়ে অনেকে ব্যক্তিগত গাড়ি, রিকশা, বাইকের দিকে ঝুঁকছেন। এতে একদিকে খরচ বাড়ছে আবার রাজধানীতে যানজট ঘনীভূত হচ্ছে। বিআইপি বলছে, বিআরটি চালু হলে যাত্রা সময় ৩০ শতাংশ কমিয়ে আনা যাবে। ঢাকার মতো মেগাসিটিতে পরিবেশবান্ধব, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী গণপরিবহনের ক্ষেত্রে বিআরটি টেকসই সমাধান। বিশেষজ্ঞরা প্রকল্প বাতিলের যে সুপারিশ করেছেন তা কারিগরি দৃষ্টিকোণে যৌক্তিক, তবে সার্বিক বিচারে একটি আঙ্গিক মাত্র। এত অর্থ ব্যয়ের পর মাত্র অল্প কাজ বাকি থাকার সময়ে প্রকল্পটি বাতিল করে সাধারণ যান চলাচলের জন্য খুলে দিলে বিআরটির মূল ধারণাই ধ্বংস হবে। স্টেশন, র‍্যাম্প ও এস্কেলেটর সরাতে আরো অর্থ খরচ করতে হবে। এমনটি হলে কোনো সমাধান আসবে না। বরং একটি উন্নত সড়ক থাকবে আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটিও যানজটে পর্যুদস্ত হয়ে উঠবে।

ঢাকা-গাজীপুর বিআরটি প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বিআইপির প্রস্তাবটি বাস্তবসম্মত। এ প্রকল্পের অব্যবহৃত বরাদ্দ দিয়ে বাস কিনে ছয় থেকে বারো মাসের মধ্যে সীমিত আকারে ডেডিকেটেড লেনসহ বিআরটি চালু করতে হবে। এছাড়া বিআরটি বোর্ড পুনর্গঠন করে বিশেষজ্ঞ ও পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। এ পথে এগোলে বিনিয়োগের একটি বাস্তব ফল পাওয়া সম্ভব। তবে কোনো সিদ্ধান্তে আসার আগে নকশা পুনর্মূল্যায়ন করে প্রকৌশলগত সমাধান খুঁজতে হবে। বিআরটি প্রকল্পের যেসব স্থান পরিচালনার জন্য অনুপযুক্ত বলে চিহ্নিত হয়েছে, সে জায়গাগুলোতে বিকল্প কী ব্যবস্থা নেয়া যায় সেটি নির্ধারণ করতে হবে। এছাড়া মিশ্র ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, স্টেশনের পুনর্বিন্যাস এবং নির্দিষ্ট অংশে বিশেষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। বিআরটি প্রকল্পটি চালু করার সিদ্ধান্তই যথেষ্ট নয়। এটি পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা থাকতে হবে। সেজন্য একটি স্বতন্ত্র ও পেশাদার কর্তৃপক্ষ গঠন করতে হবে, যেখানে পরিবহন বিশেষজ্ঞ, নগর পরিকল্পনাবিদ, আর্থিক বিশ্লেষক এবং নাগরিক প্রতিনিধিরা থাকবেন। সংস্থাটি কোনো মন্ত্রণালয়ের রুটিন আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে কার্যকর স্বায়ত্তশাসনে চলবে। প্রকল্পটির পরিচালনা ব্যয় মেটানোর বিষয়টি বিবেচনা করে স্থিতিশীল যাত্রী ভাড়া নির্ধারণ করতে হবে। স্টেশনসংলগ্ন বাণিজ্যিক স্থান ইজারা, ট্রানজিট-ওরিয়েন্টেড ডেভেলপমেন্ট (টিওডি), বিজ্ঞাপন রাজস্ব এবং প্রয়োজনে সরকারি ভর্তুকি—সব মিলিয়ে একটি মিশ্র রাজস্ব মডেল তৈরি করতে হবে। নিয়মিত স্বাধীন অডিট, কার্যক্ষমতার সূচক প্রকাশ এবং যাত্রী অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর প্রক্রিয়া থাকতে হবে। যেকোনো অনিয়মে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও ঠিকাদারদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার আইনি বিধান রাখতে হবে।

যেকোনো পরিবহন প্রকল্পে শুরুতেই নির্ধারণ করতে হবে এটি কে চালাবে, কীভাবে চলবে, রাজস্ব কোথা থেকে আসবে। অবকাঠামো নির্মাণ শুরু হওয়ার আগেই অপারেশনাল মডেল চূড়ান্ত হওয়া উচিত। পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটিসহ সংসদীয় তদারকি কমিটিগুলোকে মেগা প্রকল্পের পর্যায়ক্রমিক অডিটের ক্ষমতা ও সক্ষমতা দিতে হবে। সরকারি প্রকল্পে সমস্যা দেখা দিলে বছরের পর বছর কমিটি গঠন করে সময় নষ্ট না করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া থাকতে হবে। বিআরটি বাতিলের পথে যাওয়া হবে ভুলের ওপর আরেকটি ভুলের স্তর চাপিয়ে দেয়া। বরং সীমিত পরিসরে হলেও দ্রুত প্রকল্পটি চালু করতে হবে, প্রকৌশলগত সমস্যাগুলো সমাধান করে ডেডিকেটেড লেন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে যারা এ প্রকল্পকে দুর্দশায় নিয়ে এসেছেন, তাদের যথাযথ জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।