বিএনপি একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাতে তৈরি এ দল। প্রেসিডেন্ট জিয়ার একটি বৈশিষ্ট্য ছিল যে তিনি কথা বলতেন কম, কাজ করতেন বেশি। একদলীয় শাসন থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। সংরক্ষণবাদের অর্থনীতিকে মুক্ত অর্থনীতিতে রূপান্তরে তার ভূমিকা ছিল লক্ষণীয়। তিনি বিএনপিকেও সেভাবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। তাই দেখা যাবে, বিএনপি যতবার দেশ পরিচালনার দায়িত্বে এসেছে, প্রতিবারই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে অর্থনীতিকে। বিএনপির সময় অর্থনীতি সবচেয়ে বেশি সচল থেকেছে। সাধারণ মানুষ যেন ভালো থাকে আমরা সেদিকে বেশি গুরুত্ব দিতে চাই। বিএনপির অগ্রাধিকার হলো দেশের কৃষকরা যেন ভালো থাকেন, তাদের সব সমস্যা যেন সমাধান করা যায়, শ্রমিকরা যেন তাদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য পান এবং অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকে। এছাড়া ক্ষুদ্র অর্থনীতি যাতে শক্ত অবস্থানে দাঁড়াতে পারে। অর্থনীতির সামগ্রিক বিষয়টিকে এভাবে দেখা হয়েছে। যে কারণে লক্ষ করবেন, বিএনপি যতবার রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়েছে, কখনো শুনতে হয়নি যে বিএনপি অর্থনীতি ধ্বংস করেছে। বিএনপি অর্থনীতিকে সচল করেছে। এমনও হয়েছে সে সময় বাংলাদেশকে এমার্জিং টাইগার (উদীয়মান ব্যাঘ্র) বলা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে দেশের অর্থনীতির এসব খাতে নানা সমস্যা রয়েছে। এগুলোর সমাধান করা প্রয়োজন।
তবে সবচেয়ে বেশি ব্যবসায়ীদের ব্যাপারে চিন্তাভাবনা পরিবর্তন করা দরকার বলে ব্যক্তিগতভাবে মনে করি। বিআইডিএসের ডিজি ড. এ কে এনামুল হকের সঙ্গে একমত হয়ে বলতে চাই, এখানে চোর ধরার ব্যাপারে ব্যতিব্যস্ত না থেকে ট্রাস্ট (আস্থা) সৃষ্টিতে জোর দিতে হবে। ব্যবসায়ীকে যদি আমরা বিশ্বাসই না করি তাহলে সে ব্যবসা করে আমাকে কী দেবে? এ বিষয়গুলো ভাবা খুব জরুরি।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গত ১৫ বছর যারা অর্থনীতিতে লুটপাট করেছে, চুরি করেছে, ব্যাংক ডাকাতি করেছে, লুটপাট করে নিয়ে চলে গেছে, তাদের ধরতে হবে, শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু তাদের শিল্প-কারখানায় হাজার হাজার মানুষ কাজ করছে। সেগুলো বন্ধ করায় ১৪ লাখ মানুষ নাকি বেকার হয়েছে। তারা যাবে কোথায়? আমরা এ বেকারত্ব সৃষ্টি করছি কেন? আমি মনে করি বিষয়টি আমাদের আবারো ভেবে দেখা উচিত। বন্ধ কারখানাগুলো কীভাবে চালু করতে পারি, প্রতিষ্ঠানগুলোয় কীভাবে এ মানুষদের কর্মসংস্থান ফিরিয়ে দিতে পারি সেটা দেখা দরকার।
১৯৭৫ সালে যখন রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলো সে সময় অনেকেই ভেবেছিল বাংলাদেশ বোধহয় ডুবেই যাবে। কিন্তু শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সেখান থেকে দেশকে টেনে তুলেছিলেন। একটি তলাবিহীন ঝুড়ির অবস্থান থেকে সম্ভাবনাময় দেশ তৈরি করে গেছেন। দেশের কৃষকদের প্রচুর উৎপাদনশীলতা আছে। আমরা যদি ঠিকমতো সার-বীজ দিয়ে তাদের সাহায্য করতে পারি তাহলে আমরা কৃষিতে আরো অর্জন করতে পারব। একটা জিনিস খেয়াল করুন, ১৯৭১-এ দেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি। সে সময় খাদ্য ঘাটতি ছিল ২৮ লাখ টন। সেই বাংলাদেশ এখন খাদ্যে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। কৃষিতে আমরা যথেষ্ট অর্জন করেছি। এতে কৃষক, দেশের বিজ্ঞানী ও কৃষি নিয়ে যারা কাজ করছেন তাদের অবদান রয়েছে।
কৃষির পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে আমাদের আরো বেশি কাজ করা দরকার। একই সঙ্গে শিক্ষা খাতে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। এগুলো নিয়ে বিএনপি পরিকল্পনা করছে এবং নির্বাচনী ইশতেহারে রাখার চেষ্টা চলছে। অর্থনৈতিক পথরেখার পাশাপাশি রাজনৈতিক পথরেখাও থাকা জরুরি। রাজনীতি ও অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতার পাশাপাশি স্থায়িত্বও থাকতে হবে। সে লক্ষ্যে বিএনপি কাজ করছে। আমরা জুলাই সনদ, সংস্কার প্রস্তাব ও ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছি। সংস্কারের যেসব প্রস্তাব এসেছে সেগুলো কিন্তু আমরা অনেক আগেই দিয়েছি। ২০১৬ সালে আমাদের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ‘ভিশন-২০৩০’ দিয়েছিলেন। এখন আমরা যেসবে একমত হয়েছি তার অনেকগুলোই কিন্তু সেখানে ছিল। এছাড়া ২০২৩ সালে আমরা যে ৩১ দফা দিয়েছি সেখানে অর্থনৈতিক সংস্কার, রাজনৈতিক সংস্কার প্রায় সবই রয়েছে। আমরা সবসময় শুধু নতুন বাংলাদেশ নয়, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ দেখতে চেয়েছি। যেখানে প্রতিটি মানুষ ভালোভাবে জীবনযাপন করবে, সুশাসন থাকবে এবং যেখানে গণতন্ত্রকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হবে। অতীত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমরা বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক, সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: মহাসচিব, বিএনপি
[‘অর্থনীতির ভবিষ্যৎ পথরেখা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার’ প্রতিপাদ্যে অনুষ্ঠিত চতুর্থ অর্থনৈতিক সম্মেলনে ‘অর্থনীতির গণতান্ত্রিকীকরণ’ শিরোনামে দ্বিতীয় অধিবেশনের চেয়ার হিসেবে দেয়া বক্তৃতায়]










