২০২৪ সালে ‘বৈষম্যহীন বাংলাদেশ’ স্লোগান সামনে রেখে ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানে নিহত হাজারো শহীদের রক্তের ঋণ আমাদের ওপর আছে। ইতিহাসের একটা বৈশিষ্ট্য হলো জনগণ যখন উঠে দাঁড়ায়, তখন তারা আগের যে স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা, লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি, সেগুলোকে নতুন প্রজন্মের জন্য বহন করে নিয়ে যায়। এজন্যই ১৯৭১ সালের সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে গড়া রাষ্ট্রের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা ২০২৪ সালে আবার নতুন করে বৈষম্যহীন বাংলাদেশের দাবি হিসেবে হাজির হয়েছিল।
কড়াইল বস্তিতে আগুন লাগার বেশ কয়েকদিন হয়ে গেছে। এখনো সেখানকার মানুষ খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছে। কিছু খাদ্য ও চিকিৎসার ব্যবস্থা বেসরকারি সংগঠন ও রাজনৈতিক দলগুলো করছে। কিন্তু যেটা রাষ্ট্রের উদ্যোগে হওয়ার কথা ছিল—ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের ন্যূনতম নাগরিক স্বীকৃতি ও সহায়তা—এসব কিছুই দেখা যাচ্ছে না। অথচ ঢাকা শহর তাদের ছাড়া চলবে না। এ শহর তাদের ছাড়া চলার সক্ষমতা অর্জন করলে তারা এখানে বাঁচতে পারত না। তাদের কাজের উপযোগিতা আছে বলেই তারা আছে। আমাদের তথাকথিত সভ্য সমাজ ও ব্যবস্থাও তাদের শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বৈষম্য প্রকট হয়ে সামনে এসেছে, কিন্তু সেটাকে সমাধান করার মতো উদ্যোগ সরকারের দিক থেকে চোখে পড়ছে না।
আমরা বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্র বিস্তৃত করার কথা বলছি, এসব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আরেকটি বিষয়ও মনে রাখতে হবে, অর্থনীতিতে যেমন পুঁজি আছে, তেমনি শ্রমও আছে। উৎপাদনের আসল কারিগর শ্রমিকদের উন্নতি না হলে ব্যবসা-বাণিজ্য নিজে নিজেই বিকশিত হয় না। বৈষম্য কমানো ছাড়া অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নেই।
দৃষ্টিভঙ্গি দুটি দিক থেকে আসতে পারে। শুধু পুঁজির স্বার্থের জায়গা থেকেও দেখা যায়, আবার পুঁজির সম্পর্কে শ্রমের ভূমিকা যে মূল অংশ সেটাকেও নীতিনির্ধারণে গুরুত্ব দিতে পারি। আবার বিনিয়োগের মধ্যেও বিভাজন আছে। আমরা কী ধরনের বিনিয়োগ ও কোন খাতে বিনিয়োগ করছি, এগুলো দীর্ঘমেয়াদে শক্ত ভিত দেবে কিনা এ বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের শিক্ষা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। কিন্তু এ দেশে বিপ্লবী সমাজের বৈশিষ্ট্য ছিল প্রথম তিন-পাঁচ বছরের মধ্যে শিক্ষাকে বদলে দেয়া। এটি স্থায়ী ভিত্তির জায়গা তৈরি করে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় অনেক দুর্বলতা আছে। উচ্চমাধ্যমিক পাস করে অনেকেই যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ নিয়ে প্রশ্ন করলে ঠিকমতো উত্তর দিতে পারেন না। গত ৫৪ বছরে আমরা এ জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি। বিরাট অর্থনীতি তৈরি করতে যাচ্ছি, এ সময়ে তথ্যপ্রযুক্তি অনেক দূর এগিয়েছে। অথচ আমরা এর ধারে কাছে নেই। এ বছরে শিক্ষার্থীরা তথ্যপ্রযুক্তি ও ভাষায় ফেল করেছে বেশি। দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত প্রত্যেকটি শিশুর শিক্ষার ব্যবস্থা করবে রাষ্ট্র, সেটি কি অসম্ভব? এ শিক্ষা মানসম্পন্ন হতে হবে। এ শিক্ষা শিক্ষার্থীকে একদিকে মানবিক করবে অন্যদিকে দক্ষ করে তুলবে। শিক্ষার মানোন্নয়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। দক্ষ ও মানসম্পন্ন শিক্ষক নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে শিক্ষকের মর্যাদা ও স্বতন্ত্র বেতন স্কেল নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি পেশার চেয়েও অনেক বড় কিছু। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত আমাদের শিশুদের শিক্ষিত ও দক্ষ করে গড়ে তোলার দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে হবে। দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত এমন শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে যাতে তাকে কাজের জন্য প্রস্তুত করবে। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে রাষ্ট্রকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাঁচ কিংবা ১০ বছরে কোথায় পৌঁছাব এবং বিশ্বের চ্যালেঞ্জ কীভাবে মোকাবেলা করব, সেটি অত্যন্ত জরুরি বিষয়। অনেকে বলতে পারেন শিক্ষা কী অর্থনীতির আলোচনা? অবশ্যই অর্থনীতির আলোচনা। যারা শিক্ষাকে বাদ দিয়ে অর্থনীতিকে চিন্তা করেন তাদের মায়োপিক দৃষ্টি দিয়ে আধুনিক বিশ্বের কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা যাবে না।
সাধারণ মানুষের যদি আয় না বাড়ে, তিনি উৎপাদনের ক্ষেত্রে যদি ইনসেনটিভ না পান এবং প্রেরণা না পান তাহলে তার উৎপাদনশীলতা ধীরে ধীরে মুখ থুবড়ে পড়বে। প্রতিদিন বেঁচে থাকার জন্য কৃষক ও শ্রমিককে সংগ্রাম করতে হয়, অথচ সেখানে কোনো প্রণোদনা নেই। সাধারণ মানুষের আয় বাড়াতে না পারলে কোনো বাজার তৈরি হবে না। সুতরাং আমরা যখন সাধারণ মানুষের আয়ের কথা বলি এবং সেখানে বৈষম্য কমাতে বলি, সেটি হচ্ছে ভালো অর্থনীতি।
আয়বৈষম্য যদি কমানো না যায় তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বড় হবে না। বাজার সৃষ্টি হবে না। কোনো দেশ দেশীয় অর্থনীতির শক্ত ভিত তৈরি না করে বিশ্ব অর্থনীতির পাটাতনে দাঁড়াতে পারবে না। যেহেতু আমাদের সস্তা শ্রম আছে, তাই আন্তর্জাতিক বাজারে আমরা কেবল শোষণের হাতিয়ার হতে পারি। এর সঙ্গে আরো অনেক কিছু আসতে পারে। তারা তাদের পুঁজির নিরাপত্তার জন্য আমাদের মর্যাদা ও সার্বভৌমত্বকে গলা টিপে ধরবে। আর যদি আমরা আমাদের জাতীয় অর্থনীতির ভিত তৈরি করে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে যুক্ত হই তাহলে আমাদের জায়গা ঠিক করতে পারব। জনগণের অর্থনৈতিক জীবনমান বাড়াতে আমাদের ভিশন তৈরি করতে হবে। এজন্য আমাদের অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি দরকার, যেখানে সব ধরনের মানুষের অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত হবে। এ জায়গা থেকেই আমাদের অর্থনীতির বিনিয়োগের জায়গা দেখা দরকার।
দেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা সরকার নিজেই ও লালফিতার দৌরাত্ব্যের পাশাপাশি আমলাতন্ত্র। দেশের আমলাতন্ত্র যেভাবে ব্যবসাকে নিরুৎসাহিত করে সেটা বন্ধ না হলে ব্যবসা সম্প্রসারিত হবে না। উৎপাদনশীল খাত বিকশিত হবে না। কিছু কিছু নীতিগত সহায়তায় গত ৫৪ বছরে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যকে সম্প্রসারিত করেছে। এক্ষেত্রে প্রধান অবদান হচ্ছে দেশের উদ্যোক্তাদের সৃজনশীল ভূমিকা। উদ্যোক্তারা প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবেলা করে ব্যবসাকে দাঁড় করিয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারছি কিনা? ব্যবসা-বাণিজ্যের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলে বাংলাদেশের মানুষ নিজেই ব্যবসা দাঁড় করাতে সক্ষম হবে। নানাভাবে উদ্যোক্তা তৈরি হবে বাংলাদেশে। সেটিই ঘটছে বাংলাদেশে। এজন্য বাংলাদেশে দরকার সহায়ক নীতিমালা তৈরি করা। একটি ওয়ান স্টপ সার্ভিস তৈরি হবে কিনা। একটা লাইসেন্স করতে গিয়ে যদি ব্যবসায়ীকে দৌড়াতে হয়, ঘুস দিতে হয়, হয়রানির শিকার হতে হয়, তাহলে ব্যবসা দাঁড়াবে না। অথচ যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় বসে আছেন তারা সুযোগ খোঁজেন কীভাবে অন্যের আয়ে ভাগ বসাবেন। অধিকাংশ অর্থনীতি ক্ষমতার দিক থেকে এ রকম। বাকিটা হলো অনানুষ্ঠানিক ব্যবসা।
মানুষ আয় করবে আর একদল রাজনৈতিক বখরাজীবী ও প্রশাসন আসবে ভাগ বসানোর জন্য! আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে বখরাজীবিতা হয়ে যাচ্ছে অর্থনীতির মূল বিষয়। এ বখরাজীবিতা বন্ধ হবে কিনা এটাই বর্তমান অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ। এ বখরাজীবিতা বন্ধ হলে দেশের মানুষ তাদের সৃজনশীলতা দিয়ে অর্থনীতিকে বৈশ্বিক মানদণ্ডে নেয়ার ক্ষমতা রাখে। এ সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হলো বখরাজীবিতার বলয়ে আরো মানুষকে নিয়ে আসবে, নাকি বখরাজীবিতা থেকে বেরিয়ে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভবনা সৃষ্টি করবে। এতদিন কিন্তু বখরাজীবিতাই চলছে। এ বখরাজীবিতার মাধ্যমেই আমাদের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি পরিচালিত হয়। অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে চাঁদাবাজি চলেছে। এখন আওয়ামী লীগ চলে গেছে, সেই শূন্যস্থান কেউ না কেউ পূরণ করছে। পূরণ হচ্ছেও! ফলে আমরা নতুন চাঁদাবাজির জায়গা দেখতে পাচ্ছি। চাঁদাবাজির কাঠামোগত জায়গা বদল করা চ্যালেঞ্জ কেন বলছি?
দেশের অর্থনীতি যতটা বড় জায়গায় যাওয়ার কথা বা সম্ভাবনা রাখে, সেই জায়গায় যাওয়ার ক্ষেত্রে চাঁদাবাজির মাধ্যমে মানুষকে ঠাণ্ডা রাখার যে রাজনৈতিক অর্থনীতি সেটি একসঙ্গে চলবে না। দেশের অর্থনীতি আগামী দিনে অনেক দূর এগিয়ে যাবে বা অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়ার সম্ভাবনাও আছে। কারণ আমরা এখন ক্রসরোডে এসে দাঁড়িয়েছি! একটি দেশের কিংবা জনগোষ্ঠীর জীবনে সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ। এমন একটি অর্থনৈতিক সময় আসে তখন অর্থনীতিকে নতুন করে গ্রহণ করতে হয় বা নতুন ব্যবস্থার জন্ম দিতে হয়, তা না হলে যতটা বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে সেই বিকাশ বন্ধ হয়ে যায়, উল্টো পথ তৈরি হয়, ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়ায়। এতদিন রাজনীতি কীভাবে চলেছে সেটি দেখার বিষয় না। বরং অর্থনীতির জায়গায় যদি রাজনীতি দেখা হয়, তাহলে অর্থনীতির সম্ভাবনার জায়গা থেকে নতুন রাজনীতির জন্ম দিতে হবে। সেই রাজনৈতিক বন্দোবস্ত আমাদের সামনে হাজির আছে। চাঁদাবাজি হবে নাকি নতুন ব্যবস্থার জন্ম দেবে যেখানে সরকার-বেসরকারি কিংবা আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক খাত দুই জায়গাতেই বখরাজীবিতা বন্ধ হওয়ার জায়গায় যাবে। বখরাজীবিতা বন্ধ করে ওয়ানস্টপ সার্ভিসে যেতে হবে। পুঁজি সবসময় লাভজনক বিনিয়োগ ক্ষেত্র খোঁজে। যতক্ষণ লাভজনক বিনিয়োগ ক্ষেত্র থাকবে ততক্ষণ পুঁজি জীবন্ত থাকবে। ফলে লাভজনক বিনিয়োগ ক্ষেত্র আমাদের দেশে যেমন তৈরি করা দরকার তেমনিভাবে বিশ্ববাজারেও আমাদের ক্ষেত্র তৈরি করা দরকার।
সবশেষে বাংলাদেশে অন্তত পোষ্য অর্থনীতির যুগ শেষ। যে ক্রনি ক্যাপিটালিজমের যুগ আমরা দেখেছি, সেই ক্রনি ক্যাপিটালিজমকে কোনো না কোনো নতুন মোড়কে বাংলাদেশের মানুষ আর দেখতে চান না। দেশের মানুষ গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্রনি ক্যাপিটালিজমকে প্রত্যাখ্যান করেছে। ক্রনি ক্যাপিটালিজম থেকে দেশের ব্যাংক-আর্থিকসহ সব প্রতিষ্ঠান কীভাবে রক্ষা পাবে সেটা আগামী রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে রাজনৈতিকভাবে ধারণ করা দরকার। সেখানে সবার আগে জনগণের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে নতুন শক্তি দরকার। আমরা সেই চেষ্টা করছি।
জোনায়েদ সাকি: প্রধান সমন্বয়কারী, গণসংহতি আন্দোলন
[‘অর্থনীতির ভবিষ্যৎ পথরেখা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার’ প্রতিপাদ্যে অনুষ্ঠিত চতুর্থ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলনে ‘অভ্যুত্থানের অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষা’ শিরোনামে সমাপনী অধিবেশনে সম্মানিত আলোচকের বক্তব্যে]










