গত বছরের জুলাই-আগস্টে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুরো ২০২৫ সালই ছিল এমন একটি বছর যেটিকে বলা যায় সংস্কার আলাপ বর্ষ। বাস্তবায়নের না হোক, এটি ছিল অধ্যয়ন ও ধ্যানধারণা চর্চার বছর। সংবিধান, নির্বাচন, দুর্নীতি দমন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জনপ্রশাসন, স্থানীয় সরকার, পুঁজিবাজারসহ অধিকাংশ খাতে সংস্কার সম্পর্কে প্রতিবেদন প্রণয়ন ও ঐকমত্য পোষণের কসরত চলেছে। তবে সংস্কার চর্চার ক্ষেত্রে আর্থিক খাত, বিশেষ করে ব্যাংকিং, পুঁজিবাজার ও রাজস্ব আহরণ খাতের ক্ষেত্রে ভাগের মা গঙ্গা পায়নি বলে প্রতীয়মান হয়েছে। বছরের শুরুতে ‘শ্বেতপত্র’ আলোর মুখ দেখলেও সেখানকার মালমসলা দিয়ে কোনো রান্না বাড়ার আয়োজন চোখে পড়েনি। অথচ শ্বেতপত্রের মুখ্য উপজীব্য ছিল সদ্য পলাতক উন্নয়ন বয়ানের ব্যবচ্ছেদ, খাদের কিনারে চলে যাওয়া আর্থিক খাতের মেরামত ও চিকিৎসার প্রেসক্রিপশন। রোগী মারা যাওয়ার পর চিকিৎসক এলে যা হয় তাই হতে চলেছে শ্বেতপত্রের ভূত-ভবিষ্যৎ। শ্বেতপত্র প্রণেতারা সবাই সুকান্তর মতো তাজা তারুণ্যে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অঙ্গনের জঞ্জাল সরানোর সুর ভাজলেও কেউ যেন কথা রাখেনি ধরনের আক্ষেপ নিয়ে শ্রীমান ২০২৫ প্রস্থান করতে চলেছে। সহজেই অনুমেয় আর্থিক খাতের সংস্কার হালে পানি পায়নি। যেখানে ত্বরিৎ কিছু কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত ছিল, সংস্কারের গজেন্দ্রগামিতায় সে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
শোষণ, বঞ্চনা-বৈষম্য, সাগর চুরি, অপ্রতিরোধ্য দুর্নীতির প্রেক্ষাপটে প্রতিবাদে উত্থিত উদ্বেলিত গণজাগরণের পর আর্থিক খাতের সংস্কার বৈপ্লবিক কোনো পদক্ষেপের দ্বারা সুরাহার পথে ওঠেনি। এটা সহজসাধ্য ছিল না জেনেও ক্ল্যাসিকাল ইকোনমির পথে অনেকটা সময় নিয়ে কিছু একটা করার পথে পা রেখেই চলেছেন যারা ধরে আছেন এর হাল। চোর তো চুরি করবেই, কিন্তু গৃহস্তের সজাগ থাকার লক্ষণ দেখা মিলছে না। এটা ঠিক টাকা পাচার কমে আসাতে, ক্রমে রেমিট্যান্স বাড়াতে, ডলারের লাফালাফি কিছুটা স্থিতিশীল হওয়াতে, ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে এমন তেমন কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করতে না হওয়াতে, মেগা প্রকল্পে ব্যয়ের বহর কমাতে, সুশাসন ও জবাবদিহির কোনো উন্নতি না হওয়া সত্ত্বেও ২০২৫ সালে অর্থনীতি অনেকখানি সুস্থ ছিল বা আছে এটা দাবি করা হয়েছে বা হচ্ছে। কিন্তু মূল্যস্ফীতির দাবড়ানিতে আমজনতার অর্থনীতি আইসিইউতে যাওয়ার জোগাড়, বিনিয়োগ বঞ্চিত ব্যক্তি খাত বেকারত্বের বহর বাড়িয়ে চলেছে, একে সহনশীল ও সুসমন্বিত করার কৌশল সাফল্য লাভে এগুনোর পরিবর্তে পিছিয়ে পড়ছে।
রেমিট্যান্স, রিজার্ভ বাড়লেও কাঁচামাল ও ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানি কমে গেলে, উৎপাদন ব্যাহত হয়ে রফতানি কমে গেলেও ব্যালান্স অব পেমেন্ট এর হিসাব মেলানো কঠিন হচ্ছে, নয় কি? ডলারের দাম আকাশে তুলে সেখানে নট নড়ন-চড়ন অবস্থায় থাকতে দিলে বিনিয়োগ ও ব্যবসা বাণিজ্যেও কি হবে বা কি হাল হচ্ছে সেটা দেখতে হবে, এক্সপেরিমেন্টে বেশি সময় চলে যাচ্ছে।
২০২৫ সালে আর্থিক খাতে সংস্কার অন্যতম আলোচিত বিষয় ছিল। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের রাজস্ব সম্পদের সিংহভাগ অর্থাৎ প্রায় ৮৭ শতাংশ সংগ্রহকারী জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের শুল্ক ও কর-সংক্রান্ত রাজস্বনীতি সংস্কার, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, শুদ্ধাচার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, নাগরিক যোগাযোগ ও অংশীজন সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি ইত্যাদি বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ দেয়ার জন্য জুলাই ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক অক্টোবর ২০২৪-এ পাঁচ সদস্য সংবলিত একটি পরামর্শক কমিটি গঠন। সংস্কারের খাত বা এলাকা সুনির্দিষ্ট করা হলেও কেন, কি উদ্দেশ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের উল্লিখিত খাত সংস্কার দরকার—তা এতদসংশ্লিষ্ট আদেশে সবিশেষ উল্লেখ ছিল না। তবে সময়বারিত ও যথাযথ গুরুত্ব না দিয়ে যেনতেনভাবে পরামর্শক কমিটি গঠন করা হলেও গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নে রাষ্ট্রের অন্যান্য খাতের সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত বিভিন্ন কমিশন/কমিটির উদ্দেশ্যের ন্যায় আলোচ্য পরামর্শক কমিটির উদ্দেশ্যও অনুরূপ বলেই গণ্য। দেশের দ্রুত আর্থসামাজিক উন্নয়নে অত্যাবশ্যক রাজস্ব সম্পদের সিংহভাগ প্রদানকারী জাতীয় প্রতিষ্ঠান জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের গুরুত্ব অপরিসীম হলেও এবং উক্ত সম্পদ অধিক পরিমাণে আহরণে ব্যাপক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় সংস্কার বা আধুনিকায়নের অভাবে এটি সেভাবে তা দিতে পারছে না। ফলে কর-জিডিপি হার প্রত্যাশিত ১৫-১৬ শতাংশের স্থলে ৭-৮ শতাংশে ঘুরপাক খাচ্ছে। তাছাড়া সংস্কার না হওয়ায় বাংলাদেশে শুল্ক ও কর ব্যবস্থা প্রত্যক্ষ করের পরিবর্তে ক্রমাগত পরোক্ষ কর নির্ভর হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য নয় এবং ব্যবসা বিনিয়োগ, ভোক্তা স্বার্থ পরিপন্থী এমন উচ্চ ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ শুল্ক ও কর কাঠামো, ব্যাপক কর অব্যাহতি, বিভিন্ন প্রকার প্যারাট্যারিফ, বিকৃত কর, দ্বৈত কর, বিধিবদ্ধ ও প্রকৃত কর আপাতনে ব্যাপক ব্যবধান ইত্যাদি আধিপত্য নিয়ে এতে বিরাজ করছে। অধিকন্তু সংশ্লিষ্ট আইন, বিধি, পদ্ধতি, রাজস্ব ব্যবস্থাপনাও জটিল ও সেকেলে প্রকৃতির। এর যান্ত্রিকীকরণ তথা অন্তঃ ও আন্তঃতথ্য প্রবাহ সক্ষম, স্বেচ্ছায় পরিপালনবান্ধব, কার্যকর প্রয়োগ উপযোগী সামগ্রিক ও সমন্বিত অটোমেশন/ডিজিটালাইজেশন তেমন হয় নাই। ফলে কর পরিপালন ব্যয় বেশি, কর-জাল/কর-নেট সংকুচিত, স্বেচ্ছায় পরিপালন হার খুবই কম। আহরিত রাজস্ব, রাজস্বের প্রবৃদ্ধি, কর-জিডিপি হার, শিল্প বাণিজ্যে বিনিয়োগ কম, অনিয়ম, নির্বিচারে স্বেচ্ছা ক্ষমতার প্রয়োগ ও চ্যালেঞ্জ বেশি। রফতানির প্রত্যাশিত বৈচিত্র্যও তেমন নেই। দুর্নীতি, মুদ্রা পাচার, হয়রানি, ফাঁকি ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য ইত্যাদিতে সুশাসন ও প্রবৃদ্ধি এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায্যতা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের শুল্ক ও কর ব্যবস্থায় উল্লিখিত সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সরকার, অংশীজন, সুশীল সমাজ, ভোক্তা, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, গবেষক, মিডিয়া প্রভৃতি কম-বেশি অবহিত। অনেক আগে থেকেই এসব নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা, সমালোচনা, পরস্পরের দোষাদোষি ইত্যাদি চলছেই। সমস্যার সমাধানে বিভিন্ন সময়ে বিক্ষিপ্ত, বিচ্ছিন্ন, অসমন্বিত পদক্ষেপও নেয়া হয়। তাও আবার প্রধানত উন্নয়ন সহযোগীদের অনুদান, ঋণের শর্ত ও অংশীজনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে, সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রতিশ্রুতি থেকে নয়। এতেও প্রকৃত সমস্যার মৌলিক প্রভাব সৃষ্টিকারী সমাধান পাওয়া যায়নি। বরং সমস্যাগুলো দিন দিন আরো জটিল, রাজস্ব, বিনিয়োগ, ভোক্তা স্বার্থ ও ন্যায্যতা পরিপন্থী রূপ নিচ্ছে। সমস্যার পদ্ধতিগত, সুসংগঠিত ও ডায়াগনস্টিক এবং উত্তম চর্চাভিত্তিক স্টাডি বা পর্যালোচনা না করে সমাধান খুঁজতে গিয়ে এমন জটিল অবস্থায় রাজস্ব বিভাগ বিরাজ করছে বলে বিশেষজ্ঞ মহল মনে করেন। এ বিবেচনা থেকে সংস্কারবিষয়ক পরামর্শক কমিটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সমস্যার একটি পদ্ধতিগত, সুসংগঠিত, ডায়াগনস্টিক এবং আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চাভিত্তিক স্টাডি বা পর্যালোচনা করে এরই মধ্যে সরকারের কাছে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করেছে। শনাক্তকৃত সমস্যাগুলোর সমাধানে পরামর্শক কমিটির প্রস্তাবিত চূড়ান্ত সুপারিশগুলোর মধ্যে প্রধান বিষয়গুলো সংক্ষেপে নিম্নরূপ:
এক. রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রতিশ্রুতি ও অব্যাহত সমর্থনে উত্তম চর্চাভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানের, পর্যাপ্ত বিনিয়োগে, সময়াবদ্ধ (আগামী তিন-চার বছর) পরিকল্পনায় অংশীজনের সক্রিয় অংশগ্রহণে ও পেশাদার এবং যোগ্য নেতৃত্বে প্রতিবেদনে প্রস্তাবিত সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন হতে পারে।
দুই. আমদানি শুল্ক ও কর, স্থানীয় মূসক, আয়কর ও করপোরেট করনীতিকে বর্তমানের প্যারাট্যারিফ, বিকৃত কর যেমন নির্বিচারের উৎস কর, টার্নওভার কর, ন্যূনতম কর, উৎস মূসক, মিনিমাম, ট্যারিফ ও রেকর্ড ভ্যালু, আগাম কর, সম্পূরক শুল্ক, দ্বৈতকর/করের পুনঃপৌনিকতা ইত্যাদি হতে মুক্ত করে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীতকরণপূর্বক পরোক্ষ করনির্ভরতা হ্রাসকরত প্রত্যক্ষ ও প্রগতিশীল কর নির্ভর করা। এ লক্ষ্যে করনীতি প্রণয়ন কাজকে কর ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত কাজ হতে আলাদাকরণ এবং করনীতি প্রণয়ন বিভাগকে আন্তর্জাতিক মানে গবেষণা ভিত্তিতে, পেশাদারী মনোভাব ও আদলে তৈরীকরণ।
তিন. বিদ্যমান আইন, বিধি, পদ্ধতি সামগ্রিক সংস্কার প্রস্তাবের আলোকে ব্যবসা, বিনিয়োগ, রাজস্ব, পরিপালনবান্ধব, ব্যয় সাশ্রয়ী ও ফাঁকি নিরোধীকরণ করা।
চার. অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির আধিক্য, নির্বিচারে আরোপিত ও অযৌক্তিক শুল্ক ও কর, অব্যাহতি হতে বের হয়ে কর-নেট সম্প্রসারণপূর্বক স্বেচ্ছায় কর পরিপালন বৃদ্ধির লক্ষ্যে আইন, বিধি, পদ্ধতি সহজীকরণসহ রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে সামগ্রিক ও সমন্বিত ব্যবস্থায় সংশ্লিষ্ট সব আর্থিক ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানকে প্রকৃত সময়ভিত্তিক অন্তঃ ও আন্তঃতথ্য প্রবাহবান্ধব করে ডিজিটালি সংযুক্তিপূর্বক আন্তর্জাতিক মানে সামগ্রিক ও সমন্বিত ডিজিটাল বা অটোমেটেড ব্যবস্থাপনায় উন্নীতকরণ করা।
পাঁচ. যৌক্তিক শুল্ক ও কর কাঠামো, সহজ পদ্ধতি ভিত্তিতে সামগ্রিক ও সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থায় রাজস্ব ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা সাপেক্ষে শুল্ক ও কর ব্যবস্থাপনা বিভাগের সাংগঠনিক কাঠামো তথা সংগঠন ও জনবল আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার আদলে নির্ধারণপূর্বক তার নিয়োগ, কার্যাবলি বা দায়িত্ব, প্রশিক্ষণ, সমন্বয়, জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, পারফরম্যান্স, শুদ্ধাচার ইত্যাদি প্রস্তাবিত মতে আধুনিক ব্যবস্থাপনায় উন্নীতকরণ।
ছয়. করদাতার সচেতনতা ও স্বেচ্ছায় কর পরিপালন হার বৃদ্ধিকল্পে বিরোধ নিষ্পত্তির সহজ পদ্ধতিসহ ব্যাপক আধুনিক সমন্বিত করসেবা নিশ্চিতকরণ।
সাত. স্বেচ্ছায় কর পরিপালন সংস্কৃতির উন্নয়নের জন্য রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিমূলক সুশাসন ও রাজস্ব ব্যয়ে জনকল্যাণ ও স্বচ্ছতায় গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশের শুল্ক ও করনীতি ও ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বেশ পশ্চাদপদ, পরোক্ষ করনির্ভর, আপাতন ও প্রভাবে বৈষম্যমূলক। দেশে বিনিয়োগ উন্নয়নের পথে তা অন্যতম বাধা হিসেবে গণ্য। কাজেই কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে আন্তর্জাতিক মানে প্রণীত রাজস্বনীতি ও ব্যবস্থাপনা আরো বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। এর সঙ্গে জুলাই ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ, বৈষম্যহীন, ন্যায্যতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি বিবিধ লক্ষ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে সংস্কার করে আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক প্রতিষ্ঠানে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বর্তমানে যে রাজস্ব আহরণ করে আদর্শ করনীতির মানদণ্ডে তার প্রায় ৮০ শতাংশই পরোক্ষ প্রকৃতির কর, যা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে। এর মূল অভিঘাত উচ্চ আয়ের মানুষের ওপর না গিয়ে দরিদ্র, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের জনগোষ্ঠীর ওপর পড়ছে। এতে একদিকে রাজস্ব আয়ের কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি হচ্ছে না, আবার প্রবৃদ্ধির জন্য আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার মানদণ্ডে বিকৃত করনীতি ও ব্যবস্থা কৌশলের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে, অন্যদিকে উচ্চ আয়ের মানুষের আয়ের ওপর কর আদায় হচ্ছে না বলে সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে করনীতি ও কর রাজস্ব আহরণে বর্তমানের পরোক্ষ করনির্ভরতা হতে পর্যায়ক্রমে বের হয়ে আদর্শ ও উত্তম চর্চাভিত্তিক প্রত্যক্ষ করভিত্তিক রাজস্ব ব্যবস্থা তৈরির জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংস্কার প্রয়োজন।
বাংলাদেশের কর ভিত্তি তথা কর-নেট খুবই সংকুচিত। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মতে, জিডিপির প্রায় অর্ধেকের বেশি কর-জালের বাইরে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক হিসাব মতে দেশে স্থায়ী অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান/ইউনিটের সংখ্যা প্রায় ৬৩ লাখ। ওই হিসাবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত মূসক অব্যাহতি প্রাপ্ত টার্নওভার কর ও মূসকযোগ্য কর সীমার নিচের প্রতিষ্ঠান সংখ্যা ৮০-৮৫ শতাংশ হবে বলে ধরে নিলেও সে হিসাবে প্রকৃত মূসকে নিবন্ধনযোগ্য সংখ্যা ১০ লাখের মতো হওয়ার কথা। অথচ নিবন্ধিত আছে মাত্র ছয় লাখের মতো। প্রকৃত রিটার্ন ঘোষণায় তারও অর্ধেকের বেশি হবে না। শতভাগ দক্ষতায় নিবন্ধন সম্ভব হলে আরো প্রায় চার লাখ অর্থনৈতিক ইউনিটকে মূসকে নিবন্ধিত করতে হবে। অন্যদিকে ২০১৭-১৮ সালের বাজেটে তৎকালীন অর্থমন্ত্রীর ঘোষণা মতে আয়ের হিসাবে দেশে প্রায় চার কোটি লোক আয়করযোগ্য। অথচ নিবন্ধন হিসাবে এসেছে মাত্র এক কোটির সামান্য বেশি। আর রিটার্ন হিসাবে মাত্র ৪৫ লাখের মতো। যার মধ্যে সরকারি ও করপোরেট কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যাই বেশি। তাছাড়া দেশে কোম্পানির সংখ্যা প্রায় ২.৮০ লাখ। কিন্তু কর-জালে আছে ১ লাখেরও কম। মূসক ও আয়করের উল্লিখিত অনিবন্ধিতদের ছাড়াও নিবন্ধিতদের সংখ্যা ও মানে কর পরিপালন হার ভারিত গড় হারে আনুমানিক ৫০ শতাংশ হবে। কাজেই নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত উভয় শ্রেণীর মধ্যে করনেটের বাইরে অবস্থানকারী উল্লিখিত ব্যাপকসংখ্যক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী, করদাতা ও কোম্পানিকে মূসক ও আয়করের নেটে আনতে হবে।
বাংলাদেশের বিদ্যমান শুল্ক ও করনীতি ছাড়াও এর নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন একই সংস্থার (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) ওপর আরোপিত থাকায় ওই নীতি যেমনি করে উত্তম নীতি থেকে ক্রমে সরে যাচ্ছে, অন্যদিকে প্রণীত নীতিভিত্তিক রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনও ক্রমাগত অনুৎপাদনশীল, হয়রানিমূলক হয়ে ওঠাটা স্বাভাবিক হয়ে প্রতীয়মান হচ্ছে। এ নিরিখে উত্তম নীতি প্রণয়ন ও প্রণীত নীতি যথাযথভাবে বাস্তবায়নের স্বার্থে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নীতি প্রণয়ন কাজকে বাস্তবায়ন ও প্রশাসন হতে আলাদা করার আবশ্যকতা দেখা দেয়ায় সরকার রাজস্বনীতি এবং বাস্তবায়ন (পুনর্গঠিত এনবিআর) দুটি বিভাগ সৃষ্টি করে আইন পাস করেছে। এখন বিভাগ দুটির কার্যপরিধি (রুলস অব বিজনেস) এবং সে আলোকে সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের কাজ চলছে। এ কাজ শেষ হলেই অচিরেই বিভাগ দুটি কার্যকর হবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা অপর্যাপ্ত, খুবই কম। এ কারণে তা যথাযথ রাজস্বনীতি প্রণয়ন, প্রণীত নীতির যথাযথ বাস্তবায়ন, স্বেচ্ছায় কর পরিপালনে উদ্বুদ্ধকরণ, কর লঙ্ঘনের ক্ষেত্র যথাসময়ে চিহ্নিতকরণপূর্বক যথাযথ প্রয়োগিক ব্যবস্থা গ্রহণ ইত্যাদিতে সফল হতে পারছে না। প্রাতিষ্ঠানিক এ অপর্যাপ্ত সক্ষমতার মূল কারণ হচ্ছে—জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর ব্যবস্থাকে এখনো তথ্যপ্রযুক্তি দিয়ে কার্যকর ও সমন্বিতভাবে অটোমেটেড করা হয়নি। কার্যকর ও সমন্বিত অটেমেশন না হওয়ায় তিনটি কর ব্যবস্থাই এখনো পরস্পর থেকে প্রায় সম্পূর্ণ আলাদা। কারো সঙ্গে কারোর তথ্য আদান-প্রদান নেই বললেই চলে। এমনকি প্রতিটি কর ব্যবস্থার নিজের মধ্যেও তা নেই। ফলে কোনো করদাতারই সামগ্রিক করচিত্র সম্পর্কে জানা যায় না। তাছাড়া এতে করদাতা ও কর কর্মকর্তার মধ্যে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ সম্ভব। ফলে কর ফাঁকি, যোগসাজশ, নির্বিচারে স্বেচ্ছা ক্ষমতা প্রয়োগ, হয়রানি, অনিয়ম ইত্যাদির ব্যাপক অভিযোগ আছে। তাছাড়া এখানে করসেবার সংখ্যা ও মান সন্তোষজনক নয় বলে স্বেচ্ছায় কর পরিপালনে তা সহায়ক নয়। অধিকন্তু রাজস্বনীতি ও প্রণীত নীতির ব্যবস্থাপনায় করদাতার উত্থাপিত অভিযোগ ও সৃষ্ট বিরোধ যথাসময়ে নিষ্পত্তির বর্তমান ব্যবস্থাও যথাযথ নয় বলেও অভিযোগ আছে। বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার বিধান করা হলেও উভয় পক্ষের অনীহার জন্য তাও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কার্যকর হচ্ছে না।
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ: সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান এবং রাজস্ব খাতের সংস্কার সুপারিশ কমিটির সদস্য










