বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বছরের পর বছর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, বৈষম্যের বিস্তার ও রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা আমাদের এমন এক পর্যায়ে এনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে খণ্ড খণ্ড সংস্কার নয়, প্রয়োজন সামগ্রিক রাষ্ট্র সংস্কার। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জাতির সামনে উপস্থাপন করেছে তাদের ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার রূপরেখা—যার কেন্দ্রে রয়েছে নাগরিকের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও কল্যাণ। এ রূপরেখার কেন্দ্রীয় অঙ্গীকারটি বারবার স্পষ্ট করেছেন তারেক রহমান, স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হবে।
দশকের পর দশক ধরে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা মূলত চিকিৎসাকেন্দ্রিক ও হাসপাতালনির্ভর রয়ে গেছে। প্রতিরোধমূলক ও স্বাস্থ্য উন্নয়নমূলক সেবা, যা একটি কার্যকর ও টেকসই স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভিত্তি, নিয়মিতভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। গ্রামাঞ্চলে কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো সমন্বয়হীনতা, জনবল সংকট ও সেবা বিচ্ছিন্নতায় ভুগছে। আর শহর ও পৌর এলাকায় কার্যকর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যত অনুপস্থিত। ফলে দরিদ্র, নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী মানুষকে অনিয়ন্ত্রিত ও ব্যয়বহুল বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এ বাস্তবতা ৩১ দফা সংস্কার রূপরেখার মূল চেতনার পরিপন্থী, যেখানে রাষ্ট্রকে দূরের দর্শক নয়, বরং মৌলিক সেবার সক্রিয় প্রদানকারী হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।
এ ভারসাম্যহীনতা দূর করতে বিএনপির সংস্কার দর্শনে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে রাষ্ট্র সংস্কারের কেন্দ্রে স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্য উন্নয়ন হবে প্রথম প্রতিরক্ষা। এ কৌশলের অন্যতম মূল স্তম্ভ হলো সারা দেশে এক লাখ প্রশিক্ষিত কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ ও নিয়োজিত করার পরিকল্পনা। এ কর্মীদের প্রায় ৮০ শতাংশ নারী হবেন বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তারাই হবেন নবজীবিত প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মানবিক মেরুদণ্ড, যারা স্বাস্থ্যসেবাকে ভবনের গণ্ডি ছাড়িয়ে ঘরে ঘরে, পাড়া-মহল্লায় পৌঁছে দেবেন।
এ পরিকল্পনার আওতায় কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীরা নিয়মিত গৃহভিত্তিক পরিদর্শন, স্বাস্থ্য শিক্ষা, মা ও শিশুস্বাস্থ্যের ফলোআপ, পুষ্টি পরামর্শ, টিকাদান সহায়তা, পরিবার পরিকল্পনা সেবা এবং ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো অসংক্রামক রোগের প্রাথমিক স্ক্রিনিং করবেন। তারা হবেন নাগরিক ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রথম সংযোগস্থল—ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র, রেফারেল ব্যবস্থা ও ডিজিটাল স্বাস্থ্য রেকর্ডের সহায়তায়। এ উদ্যোগ স্বাস্থ্যসেবাকে প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থা থেকে রূপান্তর করবে আগাম প্রতিরোধমূলক জনসেবায়, যা বিএনপির ৩১ দফা সংস্কারের মূল লক্ষ্য।
মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য এ সংস্কারের কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার। এখনো বহু নারী সময়মতো গর্ভকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সেবা পান না, আর প্রতিরোধযোগ্য অপুষ্টি শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে। ব্যাপক পরিসরে কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের মাধ্যমে বিএনপি নিশ্চিত করতে চায় গর্ভবতী মায়েরা নিয়মিত ফলোআপ, পুষ্টি পরামর্শ ও ঝুঁকি শনাক্তকরণ সেবা পাবেন; আর শিশুরা পাবে বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ, বুকের দুধ খাওয়ানোর সহায়তা ও প্রাথমিক হস্তক্ষেপ। এ সেবাগুলো দোরগোড়ায় পৌঁছানোই স্বাস্থ্য, অপুষ্টি ও দারিদ্র্যের আন্তঃপ্রজন্ম চক্র ভাঙার একমাত্র কার্যকর পথ।
এ স্বাস্থ্য সংস্কার দর্শনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো অন্তর্ভুক্তিমূলকতা। সম্প্রসারিত কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী বাহিনী প্রবীণবান্ধব ও প্রতিবন্ধীবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভোগা ব্যক্তিদের ঘরে বসে ফলোআপ, চলাচলে সীমাবদ্ধ রোগীদের সহায়তা, নিয়মিত ওষুধ গ্রহণে পরামর্শ ও সহায়ক সেবার সঙ্গে সংযোগ, এসবের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে, যাতে প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী কেউই পিছিয়ে না পড়েন। একটি রাষ্ট্র সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকদের কীভাবে দেখভাল করে তার ওপর ভিত্তি করে একটি সংস্কারকৃত রাষ্ট্রের মানদণ্ড নির্ধারিত হয়। আর স্বাস্থ্য খাতেই সেই মূল্যায়ন সবচেয়ে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়।
এ সংস্কারের আরেকটি প্রধান স্তম্ভ হলো আর্থিক সুরক্ষা। বাংলাদেশ এখনো এশিয়ার অন্যতম সর্বোচ্চ ‘আউট-অব-পকেট’ স্বাস্থ্য ব্যয়ের দেশে পরিণত হয়েছে, যার ফলে প্রতি বছর লাখো পরিবার নতুন করে ঝুঁকিতে পড়ে। বিএনপি তাই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে গ্রাম ও শহরের সব সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হাঁপানি ও হৃদরোগের মতো দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক রোগের ওষুধ দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সাশ্রয়ী করা হবে সরকারি ক্রয়, মূল্যনিয়ন্ত্রণ ও লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার মাধ্যমে। আগাম রোগ প্রতিরোধ ও ওষুধের খরচ কমিয়ে বিএনপি পরিবারগুলোকে সর্বনাশা স্বাস্থ্য ব্যয় থেকে রক্ষা করতে চায়।
এ দৃষ্টিভঙ্গির অর্থনৈতিক যুক্তিও অত্যন্ত শক্তিশালী। অধিকাংশ অসংক্রামক রোগ বছরের পর বছর নীরবে বিকশিত হয় এবং কমিউনিটি পর্যায়ে আগাম শনাক্তকরণ ও জীবনাচরণভিত্তিক পরামর্শের মাধ্যমে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। প্রতিরোধমূলক ও স্বাস্থ্য উন্নয়নমূলক সেবায় বিনিয়োগ করা প্রতিটি টাকা হাসপাতালে ভর্তি, কর্মক্ষমতা হারানো ও দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতার পেছনে বহু টাকার ব্যয় সাশ্রয় করে। ফলে এক লাখ কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ কোনো ব্যয়ভার নয়; বরং এটি মানবসম্পদ, উৎপাদনশীলতা ও সামাজিক স্থিতিশীলতায় উচ্চফলনশীল বিনিয়োগ এল—যা রাষ্ট্র সংস্কারের বৃহত্তর লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি জ্ঞানভিত্তিক, প্রমাণনির্ভর ও জনগণকেন্দ্রিক রাজনীতি গ্রহণ করেছে। স্বাস্থ্য সংস্কার এখানে কোনো বিচ্ছিন্ন প্রতিশ্রুতি নয়; বরং রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার সামাজিক চুক্তি পুনর্গঠনের একটি মৌলিক স্তম্ভ। ৩১ দফা সংস্কার রূপরেখা এমন একটি রাষ্ট্রের কল্পনা করে—যে রাষ্ট্র আগেভাগে পদক্ষেপ নেয়, মানুষকে সুরক্ষা দেয় এবং আয়, অবস্থান, বয়স বা শারীরিক সক্ষমতার কারণে কাউকে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হতে দেয় না।
বাংলাদেশকে যদি আরো সুস্থ, ন্যায়ভিত্তিক ও সহনশীল রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তবে সংস্কার শুরু করতে হবে সেখান থেকেই যেখানে মানুষ রাষ্ট্রকে সবচেয়ে বেশি অনুভব করে: তাদের স্বাস্থ্যসেবায়। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা, এক লাখ কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং দোরগোড়ায় সাশ্রয়ী সেবা পৌঁছে দেয়ার মাধ্যমে বিএনপি কেবল একটি স্বাস্থ্যনীতি নয়, বরং রাষ্ট্র সংস্কার ও জনসেবার মর্যাদা পুনরুদ্ধারের একটি বিশ্বাসযোগ্য নকশা উপস্থাপন করছে।
ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার: বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এবং বিশ্বব্যাংকের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা










