দেশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখা, জনসেবা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিতের মতো গুরুদায়িত্ব পালনের দায়ভার মূলত জনপ্রশাসনের ওপর বর্তায়। দুঃখজনকভাবে বর্তমানে দেশের জনপ্রশাসনের পরিস্থিতিই অস্থিতিশীল। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময় থেকে বিভিন্ন দাবিদাওয়া ঘিরে এর পরিস্থিতি নাজুক হয়ে উঠেছে। এখানে নিয়োজিত কর্মকর্তারা প্রায় আন্দোলন করছেন, কলমবিরতিতে যাচ্ছেন, যা জনসেবা দেয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই সঙ্গে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন না হয়ে ক্রমেই অবনমন ঘটতে দেখা যাচ্ছে। জনপ্রশাসনের বিশৃঙ্খলা কাটিয়ে উঠতে না পারলে তার প্রভাব আগামী ত্রয়োদশ নির্বাচনের ওপরও পড়বে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

আসন্ন নির্বাচন ঘিরে এরই মধ্যে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। তফসিল ঘোষণার পরদিনই ঢাকা-৮ আসনের একজন সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থীর ওপর প্রকাশ্য দিবালোকে ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনা আরো একবার দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির বাস্তবতা তুলে ধরেছে।

বিগত দেড় বছরে দেশে মব ও রাজনৈতিক সহিংসতা ক্রমেই বেড়েছে। গত মাসে সারা দেশে ৯৬টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা রাজনৈতিক সহিংসতায় গত চার মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ মৃত্যু বলে উল্লেখ করেছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, সমাবেশকেন্দ্রিক সহিংসতা, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থিতা নিয়ে অন্তঃকোন্দল, কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধ ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে এসব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে বলে সংস্থাটির নভেম্বরের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ২৫৬টি ঘটনায় কমপক্ষে ১৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে সংস্থাটির আরেকটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। সহিংসতার এমন পরিস্থিতি বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্যেই দেখা গেছে। এসব পরিসংখ্যান এটিই নির্দেশ করে যে এখনো দেশের জনপ্রশাসন, বিশেষ করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে উন্নীত হতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে সহজেই অনুমেয়, নির্বাচনের আগে যদি তাদের কার্যক্রমে গতি ফেরানো না যায়, তাহলে যেকোনো ধরনের সহিংসতা আরো বড় আকার নিতে পারে।

গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘিরেই জনমনে সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার কার্যত এক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। এর অন্যতম কারণ জনপ্রশাসনকে সক্রিয় করতে না পারা। এমনিতেও দেশের জনপ্রশাসনের কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্নবিদ্ধ। বিগত সরকারের দেড় দশকের শাসনামলে যে জনপ্রশাসন কাঠামো গড়ে উঠেছিল, তা ছিল রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট। জনস্বার্থ সেখানে উপেক্ষিত ছিল। যে কারণে এ প্রশাসনের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট তীব্র হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে অন্তর্বর্তী সরকার জনপ্রশাসন সংস্কারের উদ্যোগের অংশ হিসেবে গঠন করা হয়েছিল জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন। প্রায় চার মাস নানা বিচার-বিশ্লেষণের পরিপ্রেক্ষিতে এ কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমাও দিয়েছে। এতে জনপ্রশাসনকে জবাবদিহিমূলক, দক্ষ ও নিরপেক্ষ করে গড়ে তোলার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। যদিও সেসব সুপারিশ বাস্তবায়নের কোনো কার্যকর বা দৃশ্যমান পদক্ষেপ এখনো পরিলক্ষিত হচ্ছে না। একই পরিস্থিতি পুলিশ সংস্কারের ক্ষেত্রেও। এ পর্যন্ত তাদের ‘পোশাক’ পরিবর্তনই সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। প্রায় ভুক্তভোগীদের থেকে অভিযোগ পাওয়া যায় যে ঘটনাস্থলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি দেখা গেলেও তারা নীরব ভূমিকা পালন করে। এছাড়া সাম্প্রতিক বেশকিছু আন্দোলনেও পুলিশের ভূমিকা বিতর্কিত হতে দেখা গেছে। যদিও পুলিশ ও জনপ্রশাসন সংস্কারের মাধ্যমে আইনের সঠিক প্রয়োগ ও জনগণের মৌলিক অধিকার সুরক্ষার পথ সুগম হওয়ার কথা ছিল। এমনকি জনপ্রশাসন ও পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারেও সংস্কারের সুপারিশ বাস্তবায়ন অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত। কিন্তু বাস্তবতা আগের মতোই রয়ে গেছে। ফলে বিদ্যমান জনপ্রশাসন কিংবা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্বাচনের পরিবেশ কতটা সুষ্ঠু রাখতে পারবে তা নিয়ে সন্দিহান হতে হচ্ছে।

সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের প্রধানতম ভিত্তি হলো কার্যকর, নিরপেক্ষ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ জনপ্রশাসন। নির্বাচন কমিশন এক্ষেত্রে নিয়োজিত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হলেও মাঠপর্যায়ে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব জনপ্রশাসনের ওপরই ন্যস্ত থাকে। জেলা প্রশাসন ও পুলিশের পাশাপাশি উপজেলা ও মাঠ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা ছাড়া নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়া বেশ কঠিন হবে। মনে রাখা প্রয়োজন, বিগত বিতর্কিত নির্বাচনগুলোর পেছনে বড় দায় ছিল দলীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত ও পক্ষপাতদুষ্ট জনপ্রশাসনের। অথচ জনপ্রশাসনের কার্যকারিতা শুধু রাষ্ট্রের ভিতকে মজবুত করে না, বরং নাগরিকদের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতাও প্রতিফলিত করে। একটি দলীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত, পক্ষপাতদুষ্ট প্রশাসন কখনই জনগণের সেবা নিশ্চিত করতে পারে না, যা বিগত সরকারের শাসনামলে দেখা গেছে। তাই জনপ্রশাসন সংস্কার কেবল প্রশাসনিক কাঠামো সংস্কারের বিষয় নয়, এটি গণতন্ত্র ও সুশাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত। গণতান্ত্রিক ধারার পুনরুদ্ধার ও সুশাসনের প্রতিশ্রুতিতে যে সরকার দায়িত্ব নিয়েছে, তা পরিপালনে অবশ্যই জনপ্রশাসনে শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে। এজন্য চাকরি বিধি লঙ্ঘনকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া দরকার।

গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময় থেকেই রাষ্ট্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। যদিও ‘সরকারি চাকরি (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এ বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারীরা যদি নিজেরা একত্র হয়ে কর্মবিরতিতে যান বা অন্য কর্মচারীকে দায়িত্ব পালনে বাধা দেন, তাহলে সেটি সরকারি কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি ও অসদাচরণ হিসেবে বিবেচিত হবে। এ ধরনের আচরণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে বাধ্যতামূলক অবসর, নিম্নপদে অবনমিতকরণ বা চাকরি থেকে বরখাস্ত করার বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার এ পর্যন্ত বিধিমোতাবেক তেমন কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পারেনি। সরকারের এমন নমনীয় আচরণের কারণে দিন দিন জনপ্রশাসনে বিশৃঙ্খলা বেড়েছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত। সাধারণত কোনো দাবি থাকলে তা পূরণের জন্য সাধারণ নিয়ম হলো স্মারকলিপি প্রদান। কিন্তু কর্মকর্তারা সে পথে হাঁটছেন না। তার পরও তাদের প্রতি সরকারকে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যাচ্ছে না। এদিকে নির্বাচনের তারিখ এগিয়ে আসছে। দুর্বল প্রশাসনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে নির্বাচনকেন্দ্রিক অনিয়ম ও সহিংসতার ঘটনা বৃদ্ধির ঝুঁকিও বাড়ছে। এমন পরিস্থিতি এড়াতে চাইলে অবশ্যই সরকারকে বিশেষ মনোযোগ দিয়ে জনপ্রশাসনে শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে।