শিক্ষার মানোন্নয়নে সাধারণত পাঠ্যক্রম-পাঠ্যবই, দক্ষ শিক্ষক, প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত শ্রেণীকক্ষ ইত্যাদির কথা আলোচনায় আসে। পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্য (ওয়াশ) খাতও যে এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে তা বিবেচনার বাইরে থেকে যায়। আর এর প্রতিফলনই দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘ওয়াশ ইন এডুকেশন অ্যান্ড হেলথ কেয়ার ফ্যাসিলিটিজ সার্ভে ২০২৪’ শীর্ষক জরিপে। এতে বলা হয়েছে, দেশের প্রায় ৭১ দশমিক ৪ শতাংশ বিদ্যালয়ে মানসম্মত স্যানিটেশনের সুবিধা নেই। ৫০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একটি উন্নত টয়লেট (আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ন্যূনতম সুবিধা) আছে ২৮ দশমিক ৬ শতাংশ স্কুলে। ৮০ শতাংশ স্কুলে কিশোরীদের জন্য পৃথক, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট নেই। ফলে মৌলিক মাসিককালীন সেবা পাচ্ছে মাত্র ৬ দশমিক ৯ শতাংশ বিদ্যালয়ের মেয়েরা। এমনকি বিদ্যালয়গুলোয় উন্নত পানির উৎসের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দও নেই। এ তথ্যগুলো মূলত নির্দেশ করছে যে দেশে স্বাস্থ্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়নি। যদিও গত পাঁচ দশকে উল্লেখযোগ্য হারে শিক্ষা অবকাঠামোর সম্প্রসারণ ঘটেছে। কিন্তু তাতে প্রাধান্য পায়নি ওয়াশ সুবিধা। এমনকি অনেক বিদ্যালয়ে শৌচাগার থেকে বেরিয়ে হাত ধোয়ার মতো ব্যবস্থাও নেই।

বাস্তবতা হলো কেবল শিশু স্বাস্থ্যের জন্য নয়, বিদ্যালয়গুলোয় ওয়াশ সুবিধা নিশ্চিত করা বেশ কয়েকটি কারণে জরুরি। উদাহরণ হিসেবে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) অন্তর্ভুক্ত কয়েকটি লক্ষ্যের কথা বলা যায়। এসডিজি ৪-এ অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং জীবনব্যাপী শিক্ষালাভের সুযোগ সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। বিদ্যালয়ে উন্নত স্যানিটেশন ও নিরাপদ পানির অভাবে শিশুদের নানা রোগে আক্রান্তের ঝুঁকি থাকে। ডায়ারিয়া, টাইফয়েড রোগের সংক্রমণ ঘটতে পারে। এতে তাদের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতি বাড়ে। ফলে শেখার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়।

এতে আরো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কিশোরী শিক্ষার্থীরা। মাসিককালীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা, নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন শৌচাগার না থাকায় অনেক মেয়েই স্কুলে আসা বন্ধ করে দেয়। ফলে মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের ঝরে পড়ার হার বেড়ে যায়। নারী শিক্ষার অগ্রগতির কথা বললেও বাস্তবে এ মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করতে না পারা এক ধরনের নীতিগত ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ। যদিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শৌচাগার ব্যবস্থাপনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০১৫ সালে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্যানিটেশন ব্যবস্থা উন্নত করতে একটি পরিপত্র জারি করে। যেখানে উল্লেখ করা হয়েছিল, ছাত্রীদের জন্য আলাদা শৌচাগারের ব্যবস্থা, ঢাকনাযুক্ত প্লাস্টিকের পাত্র রাখা, ঋতুকালীন বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য একজন শিক্ষিকাকে দায়িত্ব দেয়া, প্রয়োজনে টাকার বিনিময়ে স্যানিটারি ন্যাপকিন রাখার কথা।

ওয়াশ সুবিধা না থাকা এটি শিক্ষা খাতে বৈষম্যও তৈরি করে, যা অন্তর্ভুক্তি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার অন্তরায়। কারণ যেসব বিদ্যালয়ে উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থা আছে, সেখানে সন্তান পড়ানোর মতো আর্থসামাজিক অবস্থান অনেক অভিভাবকের নেই। প্রতিটি বিদ্যালয় যদি শিক্ষার্থীদের ন্যূনতম মৌলিক অধিকার রক্ষায় ভূমিকা রাখতে না পারে, তবে সেখানে মানসম্মত শিক্ষার আলোচনা অবান্তর বলা যেতে পারে।

আবার এসডিজি ৩-এ সবার জন্য সুস্থাস্থ্য ও কল্যাণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থীদের জন্যই সেটি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। স্বাস্থ্যকর শৈশব ছাড়া বাকি জীবনে কতটা সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত সম্ভব হবে তা নিয়ে সন্দিহান হতে হয়। এমনকি এসডিজি ৬-এ বিশুদ্ধ পানি ও সবার জন্য স্যানিটেশনের কথা উল্লেখ রয়েছে। বিদ্যালয়গুলোয় এগুলো নিশ্চিত করা গেলে এসসব লক্ষ্য অর্জনের পথ সুগম হতো বলেই প্রতীয়মান হয়।

দুঃখজনকভাবে শিক্ষানীতিতে শিক্ষার্থীদের সুস্বাস্থ্যকে প্রাধান্য দেয়া হয়নি। এ দুয়ের পারস্পরিক সম্পর্কটি উপেক্ষিত থেকে গেছে। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতিটি শিশুর অধিকার রয়েছে স্বাস্থ্যসম্মত শিক্ষার পরিবেশ পাওয়ার, যেখানে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা থাকবে। জাতিসংঘও এর ওপর জোর দিয়ে বলেছে, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশনের সুযোগ ছাড়া কার্যকর শিক্ষা সম্ভব নয়। এসব সুবিধা না থাকলে শিশুরা বেশি অসুস্থ হয়, নিয়মিত স্কুলে যেতে পারে না এবং ঝরে পড়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

শিক্ষা খাতে অবকাঠামো উন্নয়নের নামে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভবন ও শ্রেণীকক্ষ নির্মাণে অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। কিন্তু স্যানিটেশন সুবিধা, বিশুদ্ধ পানির উৎস নিশ্চিত এগুলোও যে অবকাঠামোগত সুবিধার অন্তর্গত সেটি পরিকল্পনায় থাকছে না। অনেক স্কুল ভবনে শৌচাগার থাকলেও তা পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য লোকবল নিয়োজন করা হয় না। কিংবা তালাবদ্ধ থাকে। এ পরিস্থিতির পরিবর্তন চাইলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজমেন্ট কমিটি, শিক্ষক, অভিভাবক সবার সচেতন ভূমিকা প্রয়োজন। আর সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। যারা এর বাস্তবায়নে উদাসীনতার পরিচয় দেবেন, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কেননা এর সঙ্গে শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট সবার স্বাস্থ্যের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ছাত্রীদের জন্য আলাদা স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতে পারে। সরকারি নির্দেশনায় শৌচাগারে পর্যাপ্ত সাবান, পানি, অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ রাখার কথা বলা হয়েছে। এগুলো ঠিকভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা তা শিক্ষা কর্মকর্তা ও স্কুল কমিটিকে মাঝেমধ্যে সরেজমিনে গিয়ে দেখতে হবে। এ ব্যাপারে আপস করা যাবে না। ছাত্রছাত্রীদেরও সচেতন করে তুলতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের ওয়াশ খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। বিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামো নির্মাণে নেয়া প্রকল্পগুলোয় বিশুদ্ধ পানি ও উন্নত স্যানিটেশনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রয়োজন, যাতে একই প্রকল্পের আওতায় তা বাস্তবায়ন করা যায়। আলাদাভাবে বরাদ্দ দেয়ার প্রশ্ন না ওঠে।

মনে রাখা প্রয়োজন, পয়োনিষ্কাশন ও পরিচ্ছন্নতা হলো সুস্বাস্থ্যের পূর্বশর্ত। মৌলিক পয়োনিষ্কাশন ও পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা না থাকলে শিশুরা সহজেই রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এ সমস্যার সমাধান হওয়া প্রয়োজন। অবকাঠামোভিত্তিক স্যানিটেশন ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা গড়ে তোলা হোক।