মৌর্য থেকে পাল শাসনামল পর্যন্ত ধারাবাহিক রাজবংশের শাসনে গড়ে ওঠা পুণ্ড্রনগর বৌদ্ধ জ্ঞানচর্চার আন্তর্জাতিক কেন্দ্র ছিল। তিব্বত ও চীন থেকে আসা পণ্ডিতদের বিবরণ থেকে এমন প্রমাণও মিলে। স্থানটির বৈশ্বিক গুরুত্ব ব্যাপক হলেও এটির অনেক কিছু আজও অনাবিষ্কৃত। বিশেষত ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় মহাস্থানগড়ের নাম নেই। ঐতিহ্যবাহী এ প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ, তদারকি এমনকি রক্ষার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের অবহেলা ও উদাসীনতার কারণে এখানে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী স্থাপনা, দখল হয়েছে অনেক ভূমি এমনকি প্রতিনিয়ত চুরি হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। এজন্য এটি এখনো ইউনেস্কোর ঐতিহ্যবাহী স্থানের অস্থায়ী তালিকাভুক্ত হয়ে আছে। এমনটি শুধু বাংলাদেশ নয়, বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক স্মৃতির জন্যও বড় ঘাটতি। একই সঙ্গে প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ বা স্থাপনার মতো ঐতিহ্যকে সাংস্কৃতিক অর্থনীতিতে রূপ দেয়ার যে সম্ভাবনা সেটিও হারাতে হচ্ছে। ভারতের হাম্পি কিংবা কম্বোডিয়ার আংকর ভাটের মতো স্থানগুলোকে পর্যটন স্পটে রূপান্তরের মাধ্যমে সংরক্ষণ করার মতো উদ্যোগ প্রতি বছর কোটি কোটি ডলার রাজস্ব এনে দিচ্ছে। এ সম্ভাবনা মহাস্থানগড়ের মাধ্যমেও অর্জন করা সম্ভব। কিন্তু কেন এখনো এ গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়নি, এ প্রশ্নটি নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্টদের সামনে অনেক আগেই রাখা দরকার ছিল।
সম্প্রতি বণিক বার্তার প্রতিবেদনে মহাস্থানগড়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার দুরবস্থার যে চিত্র মিলেছে তা থেকে দেশের অন্য প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদের অবস্থা অনুমান করা কঠিন নয়। প্রতিবেদনটিতে মহাস্থানগড়ের দুরবস্থার দুটো সমান্তরাল ব্যর্থতাই পাওয়া গেছে। প্রথমত প্রাতিষ্ঠানিক বা সংশ্লিষ্ট সংরক্ষণকারী কর্তৃপক্ষের অবহেলার বিষয়টিই চোখে পড়ে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও মহাস্থান জাদুঘরের দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনার অভাব ও ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি না থাকায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চুরি বা হারিয়েও গেছে অনেক নিদর্শন। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে এমন সাংস্কৃতিক সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে সম্পৃক্ত করার কাজটিও সম্ভব হয়নি। যারা মহাস্থানগড়ের সীমানা প্রাচীরের ইট খুলে রাস্তা নির্মাণ করছেন তাদের অনেকেই এর গুরুত্ব অনুধাবন করছেন না। এজন্য এমন একটি নিদর্শনের সুফলভোগীও তারা হতে পারেন না।
মহাস্থানগড়ের মূল সংকটকে সম্পদের অভাবের হেতু দিয়ে ব্যাখ্যা করলে ভুল হবে। বণিক বার্তার প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে এডিবি ও সরকারের যৌথ অর্থায়নে সাড়ে ৬ কোটি টাকার একটি অবকাঠামো প্রকল্প নেয়া হয়েছিল। এর অধীনে ঝুলন্ত সেতু, কাঠের ওভারব্রিজ, পিকনিক স্পট তৈরি হয়েছে। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির অভাবে আজ সেসব ব্যবহার অনুপযোগী। এদিকে ফ্রান্সে প্রদর্শনীতে নেয়া নিদর্শন হারিয়ে যাওয়ার ঘটনায় ১৯ বছরেও কোনো তদন্ত হয়নি। তদন্ত কার্যক্রম চলমান কিন্তু এর অগ্রগতির কোনো তথ্য নেই। এগুলো কেবল প্রশাসনিক শিথিলতা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ সংরক্ষণের মনোভাবের বাস্তব অবস্থা। এ শিথিলতার সুযোগ নিয়ে একটি অসাধু মহল প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাচারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। জবাবদিহির অভাব থাকায় পার পেয়ে যাচ্ছে। আবার অনেকে রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তির জোরে অনেক স্থান দখল করে নিচ্ছে। এ বিষয়ে যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া না হয় তাহলে একসময় মহাস্থানগড় ঠাঁই করে নেবে বইয়ের পাতায়। বাস্তবে এর অস্তিত্ব থাকবে না।
সাংস্কৃতিক অর্থনীতির দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করলে মহাস্থানগড়ের সম্ভাবনা বিশাল। মহাস্থানগড়কে পর্যটনবান্ধব করা গেলে একদিকে যেমন রাজস্ব আয়ের পথ তৈরি হবে তেমনি এমন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো নিজ খরচেই রক্ষণাবেক্ষণ, আধুনিকায়ন ও সংরক্ষণ করা সহজ হবে। মিয়ানমার, শ্রীলংকা, ভারত ও থাইল্যান্ডের মতো বৌদ্ধ সার্কিট পর্যটনে অন্তর্ভুক্তির বড় সুযোগ মহাস্থানগড়। বলা যায়, এ সার্কিটের প্রধান নোড হতে পারে স্থানটি। অথচ এ সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পরিবর্তে প্রাচীর ভেঙে রাস্তা বানানো হচ্ছে, প্রত্নতাত্ত্বিক ইট দিয়ে বাড়ি উঠছে, আর জাদুঘর থেকে হারিয়ে যাওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারের কার্যক্রমে কোনো গতি নেই। এমন অবস্থায় স্থানটির সংরক্ষণ ও উন্নয়নের জন্য একটি অখণ্ড, বহুস্তরীয় কৌশল দরকার। এ কৌশলে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, স্থানীয় অংশীদারত্ব এবং টেকসই পর্যটন মডেল একসূত্রে গেঁথে ফেলতে হবে।
মহাস্থানগড়কে সবার আগে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া হলেও আবেদনের প্রস্তুতি শুরু না হলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য আসবে না। এ ধরনের মনোনয়ন প্রক্রিয়া দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মনোযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি অনেক তহবিল আদায়েও ভূমিকা রাখে। এ মনোনয়নকে কূটনৈতিক অগ্রাধিকার হিসেবে নেয়া হলে ফ্রান্স ও ইউরোপের সঙ্গে বিদ্যমান প্রত্নতাত্ত্বিক সহযোগিতাকে কাজে লাগানো সম্ভব। এক্ষেত্রে ২০১৭ সালের বাংলাদেশ-ফ্রান্স যৌথ খননের অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি হিসেবে ভাবা যেতে পারে। যেকোনো প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার তদারকির জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বতন্ত্র ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক শাখার ওপর নির্ভর না করে মহাস্থানগড়ের জন্য একটি পৃথক ব্যবস্থাপনা পর্ষদ তৈরি করা জরুরি। এ পর্ষদে প্রত্নতত্ত্ববিদ, পর্যটন বিশেষজ্ঞ, স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি ও স্থানীয় সমাজ থেকে প্রতিনিধি রাখা দরকার। এ কর্তৃপক্ষই নির্দিষ্ট বাজেট ও জবাবদিহির কাঠামো বাস্তবায়ন করবে। যেকোনো সাংস্কৃতিক সম্পদ রক্ষায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সংরক্ষণকারীতে পরিণত করা জরুরি। স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে অংশীদার হিসেবে যুক্ত করার জন্য পর্যটন অর্থনীতির কৌশল প্রয়োগ করার কাজ শুরু করা যেতে পারে। প্রত্নস্থলকেন্দ্রিক হাতের কাজ, ঐতিহ্যবাহী খাবার, গাইড প্রশিক্ষণ ও হোমস্টে পর্যটন মডেলের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের জীবিকা যদি মহাস্থানগড়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়, তাহলে তারাই এর সংরক্ষক হয়ে উঠবেন।
এ ধরনের স্থানের পর্যটন সম্ভাবনাকে বিকশিত করার জন্য শুধু ‘প্রদর্শনী’ কাঠামোয় রাখা ঠিক নয়, বরং মহাস্থানগড়কে একটি অভিজ্ঞতামূলক স্থাপনাতে রূপান্তরের অবকাঠামো পরিকল্পনায় আনতে হবে। ডিজিটাল হেরিটেজ ট্যুর, অগমেন্টেড রিয়ালিটিতে প্রাচীন নগরের পুনর্নির্মাণ এবং বৌদ্ধ সার্কিট পর্যটনের সঙ্গে সংযুক্তি বিশ্বে হেরিটেজ পর্যটনের প্রমাণিত মডেল। এ ধরনের মডেল কার্যকর করতে প্রত্নতাত্ত্বিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগে গবেষণায় উৎসাহ দিতে হবে। এর জন্য যে প্রকল্প অর্থ ব্যয় হয়, তার রক্ষণাবেক্ষণ বরাদ্দ আলাদাভাবে নিশ্চিত করতে হবে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থে গড়া অবকাঠামো কয়েক বছরে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। এর মূল কারণ নির্মাণ-পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণের বরাদ্দ না থাকা। ভবিষ্যতে যেকোনো প্রকল্পে নির্মাণ ব্যয়ের কমপক্ষে ১৫ শতাংশ আলাদা করে রক্ষণাবেক্ষণ তহবিল হিসেবে রাখার নিয়ম চালু করা উচিত।
দেশে হেরিটেজ পর্যটনের বাজার এখনো তার সম্ভাবনার ছায়াতেই পড়ে আছে। মহাস্থানগড়কে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত পর্যটন করিডোর গড়ে তোলা সম্ভব। বগুড়া শহর, পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার এবং নাটোর রাজবাড়ী মিলিয়ে একটি উত্তরবঙ্গ হেরিটেজ সার্কিট তৈরি করা যায়। এ সার্কিট তিন-চারদিনের পর্যটন প্যাকেজ হিসেবে দেশী-বিদেশী পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে। বিশেষত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৌদ্ধ দেশগুলো থেকে তীর্থযাত্রী পর্যটনের যে সম্ভাবনা রয়েছে, সেটি এখন প্রায় সম্পূর্ণ অব্যবহৃত। থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, শ্রীলংকা ও জাপানের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কাছে মহাস্থানগড়ের প্রাচীন বৌদ্ধ শিক্ষা কেন্দ্রের ইতিহাস তুলে ধরার জন্য কোনো কূটনৈতিক বা সাংস্কৃতিক উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এ শূন্যস্থান পূরণ করতে পারলে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিদেশী পর্যটক টানা সম্ভব। শিক্ষা খাতে সম্প্রতি দেশীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সচেতনতাকে বাড়তি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এটিকেও অভিজ্ঞতামূলক করার জন্য দেশের ভেতর শিক্ষামূলক পর্যটনকে উৎসাহ দেয়া জরুরি। এমনটি করলে মহাস্থানগড় সরাসরি উপকৃত হতে পারে। দেশের প্রতিটি স্কুলের শিক্ষাক্রমে যদি মহাস্থানগড় পরিদর্শন বাধ্যতামূলক না হলেও উৎসাহিত করা হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে এ ঐতিহ্যের প্রতি মালিকানাবোধ তৈরি হবে। এ সচেতনতাই দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের সবচেয়ে টেকসই ভিত্তি।
মহাস্থানগড়ের অবক্ষয় হঠাৎ করে হয়নি। এটি দশকের পর দশক ধরে পুঞ্জীভূত অবহেলার ফল। কিন্তু দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলে এ অবক্ষয় অপরিবর্তনীয় নয়। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের প্রস্তাবিত প্রকল্পটি ঠিকঠাক প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন হলে এটি একটি বাস্তব সুযোগ। কিন্তু আগের মতো শুধু অবকাঠামো নির্মাণেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এখন প্রয়োজন একটি প্রাণবন্ত ব্যবস্থাপনা কাঠামো, স্থানীয় অংশীদারত্ব এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পথে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ।










