ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য আছে। এর মধ্যে একটি হলো, এ বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা নগরের কেন্দ্রে অবস্থিত। যে কারণে এটার নাম ‘ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা বা ঢাকার বিশ্ববিদ্যালয়। শহরের কেন্দ্রে অবস্থানের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়টি বর্তমানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি প্রাক্তন ও ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থী এবং তাদের পরিবার, ঢাকার বাসিন্দা ও পর্যটকসহ সব মানুষের। অবস্থানগতভাবে এ বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকার আদি ও নতুন অংশের মাঝে এক ধরনের সেতুবন্ধের মতো কাজ করেছে। কাজেই অবস্থানগত দিক থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্ব আছে।
দ্বিতীয়ত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে যাত্রার শুরু থেকেই ডিগ্রি দেয়ার পাশাপাশি বেশকিছু কাজ করতে হয়েছে। একটি হলো, ঢাকায় মফস্বল বা গ্রাম থেকে যে শিক্ষার্থীরা পড়তে আসবে, তাদেরকে পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটা মধ্যবিত্ত শ্রেণী তৈরি করতে হয়েছে। এর অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে মধ্যবিত্ত শ্রেণী পরিবর্তন আনতে পারে। এ শ্রেণী অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়, সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মূলত এ কাজ করেছে এবং সেটা খুব সফলভাবে করেছে।
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়। টিচিং (পাঠদানভিত্তিক) বিশ্ববিদ্যালয়, রিসার্চ (গবেষণাভিত্তিক) বিশ্ববিদ্যালয়। আবার অনেকগুলো আছে মিশ্র, যেখানে পাঠদান ও গবেষণা দুটোকেই গুরুত্ব দেয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুরু থেকে একটা টিচিং বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। সূচনালগ্ন থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য রাষ্ট্রের বরাদ্দ লক্ষ করলে কয়েকটা বিষয় খোলাসা হয়, যা দিয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্র মাপা যায়। প্রথমত, এ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য যে বরাদ্দ দেয়া হয় তার সিংহভাগেই শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন দেয়ার কাজে খরচ হয়ে যায়। যে কারণে এখানে গবেষণার বাজেট সবসময় অপ্রতুল থাকে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে কোনো কোনো বিভাগ হয়তো বিচ্ছিন্নভাবে ভালো গবেষণা করে। কিন্তু বাজেট স্বল্পতার কারণে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কখনই গবেষণানির্ভর বা গবেষণাকেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠতে পারেনি।
আবার এ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার কথাও না। কারণ এটা পরিকল্পনার মধ্যেই ছিল না। এটি মূলত গ্র্যাজুয়েট তৈরি করেছে, স্নাতক তৈরি করেছে। শুরুতে গ্র্যাজুয়েটের সংখ্যা কম ছিল। সময়ের পরিক্রমায় এ সংখ্যা বেড়েছে এবং এর কলেবর অনেক বেড়েছে। কিন্তু অসুবিধা হলো, আমরা একটা টিচিং ইউনিভার্সিটির কাছ থেকে গবেষণায় খুব ভালো মান আশা করি। অথচ এখানে শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে প্রমোশনের ক্ষেত্রে পরীক্ষার ভালো ফলাফলকে প্রাধান্য দেয়া হয়। যদিও একজন ভালো শিক্ষক হতে গেলে শুধু ভালো শিক্ষার্থী হওয়া বা ভালো সিজিপিএ থাকাটাই যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে আরো অনেক বিষয় সম্পৃক্ত। বিশেষত যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মূলত টিচিং বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে একজন শিক্ষক ক্লাসরুমে গিয়ে ঠিকমতো পড়াতে পারেন কিনা, কথা বলতে পারেন কিনা, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকের সংলাপ ইত্যাদি খুবই দরকারি বিষয়। এক্ষেত্রে আমার ধারণা, প্রত্যেক বিভাগেই খুব ভালো শিক্ষক বা মানসম্মত পাঠদানে দক্ষ, ভালোভাবে লেকচার ডেলিভারি দিতে পারেন—এমন শিক্ষকের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণানির্ভর বিশ্ববিদ্যালয় করতে গেলে বেশকিছু উদ্যোগ নেয়া দরকার ছিল। সেই উদ্যোগের একটা হলো, এখানে মাস্টার্সের যে মান তা দিয়ে ব্যতিক্রম ছাড়া খুব ভালো বা বিশ্বমানের প্রকাশনা তৈরি করা সম্ভব নয়। এখানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের যে কারিকুলাম তাতে গবেষণা শেখার খুব বেশি সুযোগ নেই। এর পরও যারা উন্নত মানের গবেষণা করেন বা করতে পারেন সেজন্য তারা ধন্যবাদ ও অভিনন্দন পেতে পারেন। সেটাও সম্ভব হয় হয়তো খুব ব্যক্তিগত চেষ্টা অথবা তার আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের কারণে। গবেষণাকর্মের জন্য যে প্রাতিষ্ঠানিক পরিচর্যা ও পরিকাঠামো দরকার তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেই। এর জন্য ডক্টরেট করা, পোস্টডক করা, গভীর গবেষণা করা ব্যক্তিদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে। অন্যথায় গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একেকটি বিভাগের শিক্ষককে যে পরিমাণ পাঠদানের চাপ নিতে হয়, নিজস্ব দক্ষতা ও জ্ঞানের বাইরে গিয়েও বিভিন্ন কোর্স পড়াতে হয়, এরপর গবেষণাকাজে খুব বেশি মনোযোগ দেয়ার সুযোগ থাকে না। উপরন্তু যেসব ডিপার্টমেন্টে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি, তাদের মিডটার্মের মূল্যায়ন, ক্লাস টেস্ট, অ্যাসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন দেখা, ফাইনাল পরীক্ষার খাতা দেখা—এগুলো খুবই সময়সাপেক্ষ ও মর্মান্তিক কাজ। গবেষণার জন্য চিন্তাভাবনার সময় দরকার। বিশ্ববিদ্যালয় বা বিভাগ সে সুযোগ না দিলে ব্যক্তিগতভাবে যতই চেষ্টা করা হোক সেটা খুব বেশি ফলপ্রসূ হয় না। উন্নত মানের গবেষণার জন্য দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এক. খুব ভালো সমন্বয়। দুই. পর্যাপ্ত বাজেট। এর বাইরে প্রয়োজন গবেষণার পরিকাঠামো। এসবই এখানে অনুপস্থিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার প্রাণকেন্দ্র হলেও এ প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে যে প্রত্যাশা ও বাস্তবতা রয়েছে, তার মধ্যে বড় ধরনের ফারাক দীর্ঘদিন ধরেই স্পষ্ট। বিশ্ববিদ্যালয়টি একসময় ইয়ার সিস্টেমে পরিচালিত হতো। পরবর্তী সময়ে পর্যাপ্ত পর্যালোচনা ও প্রস্তুতি ছাড়াই সেমিস্টার পদ্ধতি চালু করা হয়। সেমিস্টার সিস্টেম চালুর আগে যেসব পরিকল্পনা ও কোর্স প্ল্যানিং দরকার ছিল, তা যথাযথভাবে হয়নি। ফলে নতুন ব্যবস্থায় শিক্ষকদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, রিসোর্স বা সহায়ক সুযোগ-সুবিধা তৈরি হয়নি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে তুলনা করলে এ ঘাটতিগুলো আরো স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে ভালো করছে, তাদের দুটি বড় সুবিধা রয়েছে—উন্নত অবকাঠামো এবং টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট। একই সঙ্গে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগগুলোর শিক্ষার্থী সংখ্যাও তুলনামূলক কম থাকে। ৪০-৫০ শিক্ষার্থীর বেশি ভর্তি করানো হয় না। ফলে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত থাকতে পারেন এবং পর্যাপ্ত রিডিং ম্যাটেরিয়াল তৈরি করতে পারেন। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তবতায় শিক্ষকরা গবেষণা বা কোর্স ডেভেলপমেন্টের জন্য আলাদা সময় পান না। উন্নত বিশ্বে দেখা যায়, সামার টার্মে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় নিয়মিত ফ্যাকাল্টিদের কোনো কোর্স অফার করে না। বরং তাদের জন্য গবেষণা বা শিক্ষা ম্যাটেরিয়াল যুগোপযোগী করার জন্য সময় দেয়া হয়। এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এ রকম প্রথা নেই। বরং কোর্স কনটেন্ট আপডেট করা অত্যন্ত আমলাতান্ত্রিক হয়ে দাঁড়ায়। একটি সিলেবাস পরিবর্তন করতেও পাঁচ বছর সময় লেগে যায়।
শিক্ষার্থীদের শেখার অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রেও বড় পার্থক্য রয়েছে। বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরা প্রচুর রিডিং ওয়ার্কলোডের মধ্যে থাকে, যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে অনেক অবসর সময় পান। বিশেষ করে সামাজিক বিজ্ঞান ও কলা অনুষদের শিক্ষার্থীদের ওপর একাডেমিক পরীক্ষার বাইরে একাডেমিক চাপ তেমন একটা থাকে না। ফলে পড়াশোনার প্রতি দীর্ঘমেয়াদি মনোযোগের পরিবর্তে পরীক্ষার আগে দ্রুত প্রস্তুতির প্রবণতা তৈরি হয়। এতে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা বা জ্ঞানচর্চার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে না।
অন্যদিকে দেশের সামগ্রিক দারিদ্র্য প্রেক্ষাপটও শিক্ষার্থীদের জীবনে প্রভাব ফেলে। কাগজে-কলমে দারিদ্র্যের হার কমলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষার্থী আর্থিক সংকটে ভুগছে। অনেকেই টিউশন বা পার্টটাইম চাকরি করতে বাধ্য হন। আবার অনেককে পরিবারের খরচ চালানোর জন্য অর্থ পাঠাতে হয়। অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত সচ্ছল শিক্ষার্থীরা সাংস্কৃতিক সংগঠন, রাজনীতি বা খেলাধুলায় যুক্ত হন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় আজও সব শিক্ষার্থীর জন্য মানসম্মত আবাসন বা খাদ্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারেনি। ছাত্রদের হলগুলোয় আবাসন ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত এবং খাবারের মানও নিম্নমানের। ছাত্রীদের হলে আবাসনের সংকট আরো প্রকট। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে স্পষ্ট হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ও কল্যাণমূলক অবকাঠামো মানসম্মত নয়।
রাজনৈতিক দিক থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সবসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। স্বাধীনতা আন্দোলন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে গণতন্ত্রের সংগ্রামে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান অনস্বীকার্য। ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাঠামো ভেঙে যায়, সেশনজট তৈরি হয়। একই সঙ্গে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কও পরিবর্তিত হয়। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ছাত্র সংগঠনগুলোকে জাতীয় রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে একাডেমিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নব্বইয়ের অভ্যুত্থানের পর গণতন্ত্র বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক চরিত্রের বদল হতে শুরু করে। একসময় এ বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াত। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযশা শিক্ষকরা সত্য ভাষণ দিতেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এ ঐতিহ্য ক্ষয়ে গেছে। এতে এর রাজনৈতিক গুরুত্ব কিছুটা কমে যায়। সেই সঙ্গে নব্বইয়ের পর থেকে ঢাকার বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডও আর এ বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক থাকেনি; শহরের বিভিন্ন এলাকায় তা ছড়িয়ে পড়েছে। এটি একদিকে ইতিবাচক, কারণ বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা নীলক্ষেত-শাহবাগে সীমাবদ্ধ থাকেনি। যদিও কেউ কেউ মনে করেন যে এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য কিছুটা ক্ষুণ্ন হয়েছে।
এর পরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে অতিরিক্ত প্রত্যাশা তৈরি হয়, যা অনেক সময় বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। বিশ্ববিদ্যালয়টি অপ্রয়োজনে অতিরিক্ত মিডিয়া কাভারেজ পায়, ফলে গুরুত্বের অতিরঞ্জনও ঘটে। উদাহরণ হিসেবে সাম্প্রতিক ডাকসু নির্বাচনের কথা বলা যায়। এ নির্বাচনকে দেশের দ্বিতীয় সংসদ বা জাতীয় রাজনীতির ক্ষুদ্র সংস্করণ হিসেবে অনেকে আখ্যায়িত করেছেন। বাস্তবে ডাকসুর গঠনতন্ত্র শিক্ষার্থীদের জন্য সীমিত কার্যক্রমের সুযোগ রাখে। এক বছরের মেয়াদে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পক্ষে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। তাদের ভূমিকা মূলত ক্যান্টিন, আবাসন বা প্রশাসনের সঙ্গে দরকষাকষির মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাবের কারণে ডাকসুর নেতারা অতি প্রত্যাশা জাগিয়ে তোলেন, যা বাস্তবে পূরণযোগ্য নয়। ডাকসুর নবনির্বাচিত নেতাদের উচিত শিক্ষার্থীদের মৌলিক চাহিদা—খাবার, আবাসন, কল্যাণ নিয়ে কাজ করা। ডাকসুকে জাতীয় রাজনীতির ক্ষুদ্র সংস্করণ তৈরি করার মধ্যে এর ভালো ভবিষ্যৎ নেই। ডাকসুকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব রাজনীতির ভিত্তিতে তৈরি করতে হবে এবং সেটি হতে হবে শিক্ষার্থীসংশ্লিষ্ট, একাডেমিক পরিবেশ ও এর লক্ষ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এক্ষেত্রে সর্বাধিক জরুরি বিষয় হলো, বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি মানসম্মত শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা। নতুন নতুন বিভাগ খোলার ক্ষেত্রে যুক্তি ও প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনা করতে হবে। অনেক সময় একই ধরনের বিষয় একাধিক নামে চালু করা হয়, যা শিক্ষার মান কমিয়ে দেয়। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে ভবিষ্যতের শ্রমবাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং জ্ঞানচর্চা ও বিকাশে সহায়ক এমন বিভাগ ও পাঠক্রম গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দেয়া দরকার। পাশাপাশি শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যায় জোর দেয়ার পরিবর্তে শিক্ষার মানের ওপর গুরুত্ব দেয়া উচিত। ১০০ শিক্ষার্থীকে নিম্নমানের শিক্ষা দেয়ার চেয়ে ১০ জনকে মানসম্মত শিক্ষা দেয়া অনেক বেশি কার্যকর। ক্লাসে অতিরিক্ত ভিড় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের জন্য হতাশাজনক অভিজ্ঞতা তৈরি করে। স্বল্পসংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি করে তাদের জন্য পর্যাপ্ত আবাসন, মানসম্মত খাবার ও প্রয়োজনীয় স্কলারশিপ নিশ্চিত করতে হবে। আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের এমন স্কলারশিপ দিতে হবে, যাতে তারা পড়াশোনায় সম্পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারে।
একই সঙ্গে শিক্ষকদেরও গবেষণার জন্য আলাদা সময় দিতে হবে। একাডেমিক উৎকর্ষ তখনই আসবে, যখন শিক্ষকরা পড়ানোর পাশাপাশি গবেষণায় মনোযোগ দিতে পারবেন। সব মিলিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক মনোযোগ, শিক্ষকদের গবেষণার সুযোগ এবং প্রশাসনের বাস্তবসম্মত পদক্ষেপের ওপর। বিশ্ববিদ্যালয়কে গতানুগতিক ধারার দলীয় রাজনীতি ও অতি প্রত্যাশার চাপ থেকে মুক্ত করে একটি মানসম্মত উচ্চশিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন।
ড. দেবাশীষ কুমার কুণ্ডু: সহযোগী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়










