প্রবৃদ্ধির গতি ধীর হয়ে আসার পরও মূল্যস্ফীতি যখন আবার ঊর্ধ্বমুখী, তখন মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ ও ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ধৈর্য্য আর ‘তথ্যের ওপর নির্ভরতা’র মতো বিষয়কে দায়িত্বশীল পথ হিসেবে গুরুত্ব দিচ্ছে। মন্দার দীর্ঘস্থায়ী আতঙ্কের কারণেই তারা এ অবস্থান ধরে রেখেছে। তবে এ অবস্থান নীতিগত বিতর্ককে একটি পরিচিত প্রশ্নের দিকে ঠেলে দিয়েছে। সেটি হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদহার বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে আর কতদিন ঠেকিয়ে রাখতে পারবে? কিন্তু এ প্রশ্নটিই আসল বিষয়কে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। মূল সমস্যা মুদ্রানীতিকে কঠোর করার গতি নিয়ে নয়, বরং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এ ধারণাকে আর কতদিন টিকিয়ে রাখা যাবে সেটি। কারণ উন্নত অর্থনীতিগুলো বর্তমানে যে মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে রয়েছে, তা মোকাবেলায় উচ্চ সুদহার একটি কার্যকর কিংবা নিরপেক্ষ সমাধান বলে বিবেচিত।
বর্তমানের মূল্যস্ফীতির চাপ শ্রমবাজারের অতি সক্রিয়তা বা ভোক্তার বাড়তি চাহিদা থেকে সৃষ্টি হচ্ছে না। বরং এর মূলে রয়েছে উচ্চ জ্বালানি মূল্য, ভূরাজনৈতিক সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিঘ্ন, ভঙ্গুর সরবরাহ শৃঙ্খল ও ক্রমবর্ধমান হারে বড় করপোরেশনগুলোর দাম নির্ধারণের একচ্ছত্র ক্ষমতা। যেহেতু সমস্যাটি অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ বা ব্যয়ের কারণে নয়, তাই সুদহার বাড়ানো মূল্যস্ফীতির এ মূল কারণগুলো সমাধানে সামান্যই ভূমিকা রাখে। এ চাপ আরো তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সম্প্রতি পেট্রোলিয়াম রফতানিকারক দেশগুলোর আন্তর্জাতিক সংস্থা ওপেক থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি কেবল একটি পণ্যের সংস্থার অভ্যন্তরীণ বিবাদ নয়। বরং এ সিদ্ধান্ত জ্বালানি পণ্যের রাজনৈতিক অর্থনীতিতে গভীর কাঠামোগত পরিবর্তনের সংকেত পাওয়া যায়। বিশ্ব জ্বালানি তেলের বাজারে ক্ষমতার পরিবর্তনশীল গতি, ব্যাপক আর্থিকীকরণ ও ভূরাজনৈতিকভাবে ভারাক্রান্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনার ভারে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বল হয়ে পড়ার বিষয়টিকেই ইঙ্গিত করে। দীর্ঘদিন ধরে ওপেকের প্রভাব তার সদস্যদের সংযমের ওপর নির্ভর করে এসেছে। এজন্য আরব আমিরাতের বিদায় এটির সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় জোটটির ঐতিহ্যগত ভূমিকাও ক্ষুণ্ন করছে। সংস্থাটির অন্যতম প্রধান ও নমনীয় জ্বালানি পণ্য উৎপাদনকারী দেশ চলে যাওয়ায় ব্যবস্থাপনাগত সমন্বয় ধরে রাখা কঠিন হয়ে গেছে। এতে বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে। ফলে জ্বালানি তেলের বাজারে যৌথ কৌশল আপাতত দেখা যাচ্ছে না, বরং বিভাজন, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিসম্পন্ন ও একতরফা সিদ্ধান্তের ওপর ভর করে সংস্থাটি প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে। এজন্য বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো দীর্ঘ সময় সুদহার ধরে রাখলে মূল্যস্ফীতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের গ্রহণযোগ্যতা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়। এর বিপরীতে সুদহার দ্রুত বাড়ালে অর্থনৈতিক মন্দার চাপ গভীর হতে পারে। এতে সরকারি ও বেসরকারি ঋণের বোঝা আরো বাড়বে এবং আবাসন ও জ্বালানির ক্রমবর্ধমান ব্যয়ে জর্জরিত সাধারণ মানুষের জীবন আরো দুর্বিষহ হয়ে উঠবে।
এ প্রেক্ষাপটে মুদ্রানীতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো স্পষ্ট নীতিগত বিকল্পগুলোকে স্বাধীনভাবে বেছে নেয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। তারা আর্থিক বাজার, ভঙ্গুর রাজস্ব অবস্থা ও রাজনৈতিক চাপের (বিশেষ করে বেকারত্ব নিয়ে) কারণে তৈরি হওয়া এক কঠোর কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করছে। বাজারের পক্ষ থেকে ক্রমবর্ধমান হারে সুদহার বৃদ্ধির প্রত্যাশা করা হচ্ছে—মূল্যস্ফীতি সমাধান হবে বলে নয়, বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ব্যবস্থা নিতে বাধ্য অনুভব করছে বলে। এও সত্য, তাদের হাতে থাকা হাতিয়ারগুলো এ কাজের জন্য মোটেই উপযুক্ত নয়।
এ নীতিগত প্রতিক্রিয়ার বণ্টনমূলক ফলাফলগুলো প্রায়ই এড়িয়ে যাওয়া হয়। উচ্চ সুদহার একটি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। কারণ এটি সম্পদের মূল্য রক্ষা করে, ঋণদাতাদের পুরস্কৃত করে এবং সমন্বয়ের পুরো বোঝা চাপিয়ে দেয় শ্রমিক, বন্ধকি ঋণগ্রহীতা এবং ঋণের দায়ে জর্জরিত দেশগুলোর ওপর। জ্বালানি খাতের একচেটিয়া আধিপত্য, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও সরবরাহ বিঘ্নের কারণে মূল্যস্ফীতি ঘটলেও একে শ্রমবাজারের সমস্যা হিসেবে চিত্রিত করা একটি রাজনৈতিক পছন্দ, কোনো অর্থনৈতিক অনিবার্যতা নয়। বাস্তবে উচ্চ সুদহার মূল্যস্ফীতি দূর করে না, বরং উচ্চ বেকারত্ব, পরিবারের বর্ধিত ঋণ এবং রাজস্ব সংকোচনের মাধ্যমে এর খরচকে পুনর্বণ্টন করে। এটি মুদ্রানীতির কোনো অনিচ্ছাকৃত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নয়, বরং মূল্যস্ফীতি ব্যবস্থাপনার এটিই সাধারণ কৌশল।
এ বাস্তবতা বিতর্কের ধারায় খুব একটা পরিবর্তন আনতে পারেনি। নীতিনির্ধারকরা মূল্যস্ফীতিকে একটি কাঠামোগত ও বণ্টনমূলক সমস্যা হিসেবে না দেখে কেবল একটি মুদ্রানীতিগত সমস্যা হিসেবে গণ্য করে যাচ্ছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো আর্থিক পরিস্থিতি কঠোর করে এর জবাব দিচ্ছে, কিন্তু উচ্চ সুদহার খাবারের দাম কমাতে কিছুই করতে পারে না—যে দাম মূলত সার ও জ্বালানির আকাশচুম্বী ব্যয়ের প্রতিফলন। তবে সুদহার বৃদ্ধি কর্মসংস্থান হারানো, বন্ধকি ঋণের দুর্দশা ও দারিদ্র্যকে স্থায়ী করার ঝুঁকি ঠিকই বাড়িয়ে দেয়। মূল্যস্ফীতি যদি বছরের পর বছর এভাবে বজায় থাকে, তবে তা সামাজিকভাবে মানুষকে ক্লান্ত করে তুলবে। ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা, পুষ্টিহীনতা ও স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটিয়ে পরিবারগুলো অনির্দিষ্টকাল এ উচ্চ ব্যয় বহন করতে পারবে না। সে পর্যায়ে মূল্যস্ফীতি আর কেবল একটি অর্থনৈতিক ইস্যু থাকে না, বরং এটি রাজনৈতিক অস্থিরতার উৎস হয়ে দাঁড়ায় এবং প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতার সংকট তৈরি করে।
এ পরিস্থিতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বর্তমান পদ্ধতির সীমাবদ্ধতাকেই ফুটিয়ে তুলছে। মূল্যস্ফীতি যখন জলবায়ু বিপর্যয়, যুদ্ধ ও অপরিহার্য সম্পদের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে যায়, তখন শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে বড় ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি ছাড়া দাম স্থিতিশীল করা সম্ভব নয়। উচ্চ সুদহার চাহিদাকে দমন করতে পারে, কিন্তু এটি তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন করতে পারে না, বন্দর সচল করতে পারে না, সরবরাহ শৃঙ্খল মেরামত করতে পারে না কিংবা করপোরেট মুনাফার উচ্চহার কমাতে পারে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদহার বৃদ্ধি বিলম্বিত করতে পারে, ধীরে এগোতে পারে বা ‘ঐচ্ছিক বিরতি’ নিতে পারে। কিন্তু এ ধরনের কৌশলগত সমন্বয় সে মৌলিক দ্বন্দ্বের সমাধান করে না—নীতিনির্ধারকরা চাহিদা ব্যবস্থাপনার জন্য তৈরি করা একটি কারিগরি হাতিয়ার ব্যবহার করছেন এমন মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করতে, যা আসলে কাঠামোগত ও রাজনৈতিক শক্তি দ্বারা চালিত।
যতক্ষণ না এ দ্বন্দ্বের সমাধান হচ্ছে—সমন্বিত জ্বালানিনীতি, সরকারি বিনিয়োগ, মূল্য নিয়ন্ত্রণ, শিল্প কৌশল বা সক্রিয় রাজস্ব হস্তক্ষেপের মাধ্যমে, ততক্ষণ সুদহার কেবল ওঠানামা করবে কিন্তু মূল সমস্যার সমাধান হবে না। সুদহার কঠোর করা তখন নিয়ন্ত্রণের একটি প্রতীকী অঙ্গভঙ্গি হিসেবেই থেকে যাবে, যা প্রকৃত কোনো সমাধান দিতে পারবে না। সমস্যার মূলে রয়েছে জ্বালানি বাজার, করপোরেট ক্ষমতা ও ভূরাজনৈতিক সংঘাতের ফলে সৃষ্ট সংকট মোকাবেলায় নীতিনির্ধারকদের সুদহারের ওপর ক্রমাগত নির্ভরতা, যা আসলে মূল্যস্ফীতিকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে তারই প্রতিফলন। কাঠামোগত মূল্যস্ফীতিকে চাহিদা ব্যবস্থাপনার সমস্যা হিসেবে গণ্য করা নীতিনির্ধারকদের এক ধরনের সুবিধা তৈরি করে। এর মাধ্যমে তারা দাম নির্ধারণকারী, সম্পদ নিয়ন্ত্রক ও মুনাফা অর্জনকারীদের সঙ্গে কঠিন দ্বন্দ্বে না জড়িয়েও নিজেদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে জাহির করতে পারেন। এটিও একটি নীতিগত পছন্দ, যার সামাজিক মূল্য উপেক্ষা করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
ক্যারোলিনা অ্যালভিস: সহযোগী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইনস্টিটিউট ফর ইনোভেশন অ্যান্ড পাবলিক পারপাস, ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন। ফেলো, ইউনিভার্সিটি অব কেমব্রিজ গার্টন কলেজ










