বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্বের ৩৫তম বৃহত্তম অর্থনীতি। আমাদের অর্থনীতি গত পাঁচ-ছয় বছরে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছে। তার মধ্যে আছে কভিড মহামারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, সময়মতো এলসি খুলতে না পারা, বাংলাদেশী টাকার অস্বাভাবিক অবমূল্যায়ন, বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে এক্সচেঞ্জ রেটের উল্লেখযোগ্য পতন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, জুলাই অভ্যুত্থান, বেশ কয়েকবারের বন্যা। এমন পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক রেটিং এজেন্সি মুডি’স, এসঅ্যান্ডপি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নিম্নমুখী রেটিং করেছে। তার ধারাবাহিকতায় আমাদের যে কনফার্মিং ব্যাংক আছে, যারা এলসি খোলা নিশ্চিত করে, সেখানে আমদানি খরচ অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। আমাদের বেশকিছু ব্যাংকের ওপর তারা এক্সপোজার নিতে চান না। ফলে সময়মতো এলসি খোলা কঠিন হয়ে পড়েছিল, এখন কিছুটা সহজ হচ্ছে। সময়মতো এলসি খুলতে না পারা এবং মুদ্রা অবমূল্যায়নের কারণে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল রিকোয়্যারমেন্ট ৬০ শতাংশ বেড়ে গেছে। এগুলো মোকাবেলা করতে হচ্ছে বাংলাদেশের স্টিল এবং সিমেন্ট খাতকে।
আমরা অত্যন্ত সংকটময় সময় পার করছি। আমাদের কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে পারছি না। বর্তমানে আমাদের সক্ষমতার ৪০-৫০ শতাংশ চালাতে পারি। এ কারণে আমাদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। আমাদের এ খাতগুলো ক্ষতির মুখে পড়েছে। আমাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গভর্নর একটি নীতিসহায়তা দিয়েছেন। এজন্য তিনি ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিসহায়তা হয়তো সাময়িক ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা দেবে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি অনেক কিছু করা প্রয়োজন। আমরা প্রত্যাশা করছি, বর্তমান সরকার বা ভবিষ্যৎ যে রাজনৈতিক দল সরকার গঠন করবে তাদের কাছে। বিশেষ করে গত প্রায় দুই বছরে কোনো উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড হচ্ছে না। মেগা প্রকল্পগুলো এখন আর নেই। সরকারি-বেসরকারি খাতে উন্নয়ন ব্যয় অনেক কম হচ্ছে। বেসরকারি খাত নতুন করে কারখানা সম্প্রসারণ করছে না। এসব কারণে স্টিল ও সিমেন্ট শিল্প খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
গভর্নর মহোদয়ের কাছে আমাদের আরো কিছু আর্জি আছে। আপনারা জানেন, বর্তমানে আমাদের ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল রিকোয়্যারমেন্ট ৬০ শতাংশ বেড়েছে। এখানে ৪২-৪৩ শতাংশ বেড়েছে কেবল টাকার অবমূল্যায়নের কারণে। পাশাপাশি আমদানি শুল্ক থেকে শুরু করে অন্যান্য কারণে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল রিকোয়্যারমেন্ট ৬০ শতাংশের মতো বেড়েছে। ঋণ অনুমোদন সত্ত্বেও অনেকগুলো ব্যাংক এলসি করতে পারছেন না। আপনারা সবাই জানেন, অনেকগুলো ব্যাংক স্থবির হয়ে আছে। এতে বিদেশী কনফার্মিং ব্যাংকগুলো এক্সপোজার নিচ্ছে না। এতে আমাদের মূলধন প্রয়োজন মেটানোর জন্য সবল ব্যাংকগুলোর ওপর নির্ভরশীল থাকতে হচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি মানি মার্কেট বা ব্যাংক খাত নির্ভর অর্থনীতি। আমাদের পুঁজিবাজার (ক্যাপিটাল মার্কেট) নেই বললেই চলে। দেশের পুঁজিবাজারের আকার আমাদের জিডিপির ৭ শতাংশ। দেশের পুঁজিবাজারের আকার অত্যন্ত ছোট। আমাদের দেশে কোনো বন্ড মার্কেট বা ইকুইটি মার্কেট নেই। অথচ প্রতিবেশী দেশ ভারতের পুঁজিবাজার তাদের জিডিপি থেকেও ১৩০ শতাংশ বেশি। অন্যান্য দেশে পুঁজিবাজারের আকার আরো বেশি। কারখানা স্থাপন, ব্যবসা-বাণিজ্য করার জন্য তাদের ব্যাংক থেকে লোন নিতে হয় না। তারা ক্যাপিটাল মার্কেট, বন্ড বা ইকুইটি মার্কেট থেকে টাকা নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করে। গভর্নরের কাছে অনুরোধ থাকবে ১৫ শতাংশ সিঙ্গেল এক্সপোজারের যে লিমিট রয়েছে, সেটা যেন ৩০ শতাংশ করে দেয়া হয়। তাহলে আমরা কিছুটা সুবিধা পাব।
সুদহার নিয়ে আলোচকরা কথা বলেছেন। বাংলাদেশে নীতি সুদহার ১০ শতাংশ। অথচ ভারতে সাড়ে ৫ শতাংশ, থাইল্যান্ডে ৫ শতাংশ, ভিয়েতনামে সাড়ে ৪ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় সাড়ে ৪ শতাংশ এবং চীনে সাড়ে ৩ শতাংশ। ১০ শতাংশ নীতি সুদহার পাকিস্তানে (১১ শতাংশ) ছাড়া অন্য কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই। আমরা যাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে যাচ্ছি তাদের নীতি সুদহার ৫-৬ শতাংশ। গভর্নরের কাছে অনুরোধ নীতিসুদটা কমিয়ে দিলে আমরা কিছুটা স্বস্তি পাব। পাশাপাশি ট্রেজারি বন্ডের ওপর ১১-১২ শতাংশ সুদ দেয়া আছে, যা ব্যাংকগুলোকে আকৃষ্ট করছে। ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তাদের ঋণ না দিয়ে ট্রেজারি বন্ডে ঝুঁকি থাকে না বলে ব্যাংকগুলো সেখানে বিনিয়োগ করছে। এতে ব্যবসায়ীরা ঋণ পাচ্ছেন না। ট্রেজারি বন্ডের সুদহার এমনভাবে করা উচিত যাতে আমরা ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ পাই। আমরা ব্যাংক থেকে যে হারে লোন পাব তা থেকে ২-৩ শতাংশ কম করা যেতে পারে ট্রেজারি বন্ডের সুদহার।
আমাদের ওপর অযাচিত ট্যাক্স চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। কাঁচামাল আমদানি পর্যায়ে আমরা আমদানি শুল্ক ও অন্যান্য শুল্ক দিয়ে থাকি। অথচ আমদানি শুল্কের পাশাপাশি অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্সও দিতে হয়। কয়েক বছর আগে চূড়ান্ত মূল্যায়ন করে সেটাকে যুক্ত করতে পারতাম। কিন্তু এখন আর পারছি না। শুধু তা-ই না, আমদানি পর্যায়ে ট্যাক্স দিয়ে পরবর্তী সময়ে সে পণ্য সরবরাহ করার সময়ও ট্যাক্স দিতে হয়। দুইবার করে ট্যাক্স দিতে হচ্ছে, এটাই নাকি চূড়ান্ত ট্যাক্স। এবার যুক্ত হচ্ছে পুরোপুরিভাবে টার্নওভার ট্যাক্স। আগে এটি ছিল শূন্য শতাংশ। এখন সেটা ১ শতাংশ। অর্থাৎ আমার যদি প্রতি বছর ১০ হাজার কোটি টাকার টার্নওভার থাকে, তার বিপরীতে ১০০ কোটি টাকা টার্নওভার ট্যাক্স দিতে হবে। এটা যদি আমদানি পর্যায়ে ৫০ কোটি, সরবরাহ পর্যায়ে ৩০ কোটি টাকা দিয়ে আসি, তাহলে টার্নওভার দিতে হবে ২০ কোটি টাকা। আমার কোম্পানি লাভ করুক বা লোকসান এটা দিতেই হবে।
এটা দেশীয় বিনিয়োগেও বড় বাধা। আমি লাভ করলে তার ওপর ট্যাক্স দেব এটাই নিয়ম। কিন্তু লোকসান করলেও ট্যাক্স দিতে হবে এমন নিয়ম পৃথিবীর অন্য কোথাও আছে কিনা জানা নেই। ট্যাক্সের বোঝা না চাপিয়ে ট্যাক্স নেটওয়ার্ক বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ৭ শতাংশ। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশে ভারতে ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ১২ শতাংশ। নেপালে ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ১৩-১৬ শতাংশ। ভিয়েতনামের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ৩৩ শতাংশ। বিদ্যমান কোম্পানিগুলোর ওপর ট্যাক্সের বোঝা না বাড়িয়ে ট্যাক্সের নেটওয়ার্ক বাড়াতে হবে।
পরবর্তী সময়ে যারা ক্ষমতায় আসবেন তাদের অনুরোধ করব ক্যাশলেস লেনদেনটা শুরু করতে। ডিজিটাল পেমেন্টের মাধ্যমে করা হলে সব লেনদেন ট্যাক্স নেটওয়ার্কের ভেতরে চলে আসবে। ভারত এটি করেছে। যার কারণে তাদের ট্যাক্স জিডিপি অনুপাত ১২ শতাংশ হয়েছে। এছাড়া ক্যাশলেস লেনদেন শুরু করলে যে ৩-৪ লাখ কোটি টাকা অলস পড়ে আছে, সেগুলো ব্যাংকে চলে আসবে। তখন দুর্নীতিও কমবে। তাই বলব বর্তমান সরকার ও আগামীতে যারা ক্ষমতায় আসবেন আপনারা ক্যাশলেস লেনদেনটা চালু করেন। তাহলে আমাদের ওপর ট্যাক্সের বোঝা কমবে।
মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম: বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএমএ) সভাপতি ও জিপিএইচ গ্রুপের চেয়ারম্যান
[‘অর্থনীতির ভবিষ্যৎ পথরেখা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার’ প্রতিপাদ্যে অনুষ্ঠিত চতুর্থ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলনে ‘ব্যবসা, বিনিয়োগ ও সামষ্টিক অর্থনীতি’ শিরোনামে উদ্বোধনী অধিবেশনে সম্মানিত আলোচকের বক্তব্যে]










