বাবার কাছ থেকে হেবা
দলিলে জমি পেয়ে সেখানে তৈরি করেছেন ৮ তলা বাড়ি। বাড়ি তৈরির জন্য ব্যাংক থেকে নিয়েছেন
ঋণ। দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে এমন ঘোষণা দিয়েছেন রাজধানী
উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সহকারী পরিচালক শামসুল আলম মিলকী। কিন্তু দুদকের অনুসন্ধানে
উঠে এসেছে তিনি অবৈধ আয় দিয়ে জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ করেছেন। এই অভিযোগে তার বিরুদ্ধে
একটি মামলা দায়ের করেছেন দুদকের সহকারী পরিচালক কামিয়াব আফতাহি-উন-নবী।
এজাহারে অভিযোগ আনা
হয়েছে, শামসুল আলম মিলকী ঢাকার উত্তরা আবাসিক এলাকায় ৪ কাঠা ৬ ছটাক ৩২ বর্গফুট জমি
তার বাবার কাছ থেকে হেবা দলিলে পেয়েছেন বলে সম্পদ বিবরণীতে ঘোষণা দেন। জমি ক্রয়ের
প্রক্রিয়া পর্যালোচনায় দেখা যায়, সিলেটের বাসিন্দা রায়হান উদ্দিন চৌধুরী রাজউক
সম্প্রসারিত উত্তরা আবাসিক এলাকার ১৭/বি সেক্টরে ৩ কাঠা আয়তনের ২২ নম্বর প্লটটি বরাদ্দ
পান। এরপর তিনি মিলকীকে আমমোক্তার নিয়োগ করেন। মিলকী আমমোক্তার হিসাবে রাজউকের প্রভাব
খাটিয়ে ওই প্লটটি পরিবর্তন করে উত্তরা আবাসিক এলাকার ৯ নম্বর সেক্টরে ৪ কাঠা ৬ ছটাক
৩২ বর্গফুট আয়তনের একটি প্লট নেন। এরপর হঠাৎ রায়হান উদ্দিন চৌধুরী প্লট বিক্রির ইচ্ছা
পোষণ করলে মিলকীর বাবা পৈলান মিলকী সেই প্লট কিনে নেন। এরপর ২০১৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি
মালিকানা লাভের প্রায় ২ মাসের মধ্যেই ২৫ মার্চ অন্য সন্তানদের বাদ দিয়ে পৈলান মিলকী
এককভাবে শামসুল আলম মিলকীকেই পুরো জমি হেবা করে দেয়ার আবেদন করেন। দাপ্তরিক প্রক্রিয়া
শেষে ৩০ মে উত্তরা সাব-রেজিস্টি অফিসে হেবা সম্পন্ন হয়। ঘটনাক্রম বিশ্লেষণ করলে বোঝা
যায়, হেবামূলে বাবার কাছ থেকে প্রাপ্ত ৮০ লাখ ৮ হাজার ৮৩৯ টাকার জমিটি মূলত শামসুল
আলম মিলকীর অবৈধ অর্থেই কেনা হয়েছিল। পরে প্লটটিতে শামসুল আলম মিলকী আট তলা ভবন নির্মাণ
করেন। প্লট তৈরির জন্য ব্যাংক থেকে এককভাবে ঋণ গ্রহণ করেন। ভবনটির অরেজিস্ট্রিকৃত ফ্লোর
বা ফ্লাটের বণ্টননামা দলিলমূলে শামসুল আলম মিলকী তার পাঁচ ভাই ও মাসহ সাত জনের মধ্যে
বন্টন করা হবে মর্মে রাজউক উত্তরা জোনাল অফিসের উপপরিচালকের (এস্টেট ও ভূমি -২) কাছে আবেদন করেন। তাদের আবেদন গ্রহণ করেনি রাজউক। ব্যাংক
থেকে নেয়া ঋণের সব অর্থ তারা সব ভাই মিলে পরিশোধ করবে উল্লেখ করে অঙ্গীকারনামা সম্পাদন
করেন। কিন্তু তার ভাইদের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করলে দেখা যায়, তাদের আর্থিক সামর্থ্য
নেই, যা দিয়ে তারা তাদের নামে বরাদ্দ ওই ফ্ল্যাটগুলোর ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন। অর্থাৎ,
দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণীতে হেবামূলে বাবার কাছ থেকে প্রাপ্ত ৮০ লাখ ৮ হাজার ৮৩৯ টাকা
মূল্যের সম্পদ এবং নিজেসহ পাঁচ ভাই ও মায়ের নামে দেখানো আট তলাবিশিষ্ট বাড়িটিতে তার
অংশ ২৯ লাখ ৮৪ হাজার ৮৭০ টাকা দেখানো হলেও পুরো বাড়িটিই মূলত তার নিজের। এখানে তিনি
২ কোটি ৯০ লাখ টাকা মূল্যের সম্পদের প্রকৃত তথ্য গোপন করেছেন।
২০১৭ সালের ৩১ অক্টোবর
তিনি দুদকে সম্পদ বিবরণী দাখিল করেন। সম্পদ বিবরণীতে ৩০ লাখ ২৫ হাজার ৮৭১ টাকা মূল্যের
স্থাবর ও ৪ লাখ ৬১ হাজার টাকা মূল্যের অস্থাবরসহ মোট ৩৪ লাখ ৮৬ হাজার ৮৭১ টাকা মূল্যের
সম্পদ এবং ২১ লাখ ৭১ হাজার ৪২৯ টাকার ঋণের ঘোষণা দেন।
সম্পদ বিবরণী যাচাইকালে
শামসুল আলম মিলকীর নামে ৪ কোটি ৩৪ লাখ ৭১০ টাকা মূল্যের স্থাবর ও ৪ লাখ ৬১ হাজার টাকা
মূল্যের অস্থাবরসহ মোট ৪ কোটি ৪ লাখ ৯৫ হাজার ৭১০ টাকা মূল্যের সম্পত্তির বিপরীতে মোট
১ কোটি ১৬ লাখ টাকার ঋণের তথ্য পাওয়া যায়। দায় বাদে তার নিট সম্পত্তির পরিমাণ ২
কোটি ৮৮ লাখ ৯৫ হাজার ৭১০ টাকা। এই সম্পত্তি অর্জনে তার বৈধ উৎসের আয় পাওয়া গেছে ৯২
লাখ ৬৩ হাজার ৩৬৩ টাকা। সম্পদ বিবরণীতে ৩ কোটি ৭০ লাখ ৮ হাজার ৮৩৯ টাকা মূল্যের স্থাবর
সম্পদের তথ্য গোপন করে ভিত্তিহীন মিথ্যা ঘোষণা দেন। অর্থাৎ, তিনি ১ কোটি ৯৬ লাখ ৩২
হাজার ৩৪৭ টাকা মূল্যের আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পত্তির মালিকানা অর্জন করেছেন।
যা, দুদক আইন, ২০০৪ এর ২৬ (২) ও ২৭ (১) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এই প্রসঙ্গে শামসুল
আলম মিলকী বণিক বার্তাকে বলেন, আমি গত ৫ ফেব্রুয়ারি অবসরে গেছি। মামলা দায়েরের বিষয়টি
আমি জানি না। ২০১৩ ও ২০১৬ সালেও অভিযোগ অনুসন্ধান শেষে নিষ্পত্তি হয়েছে। এখন দুদক মামলা
করে থাকলে আইন অনুযায়ী আমি মোকাবিলা করব।










