স্থলপথে বাণিজ্যের অন্যতম রুট বেনাপোল বন্দর।
দেশের আমদানি-রফতানির উল্লেখযোগ্য সম্পন্ন হয় এ বন্দর দিয়ে।
কিন্তু পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধার অভাবে এ বন্দর ব্যবহারের আগ্রহ হারাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
সম্প্রতি বন্দরে আমদানি করা ব্লিচিং পাউডারবাহী একটি ট্রাক পুড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আবারো বিষয়টি সামনে এসেছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অগ্নিনির্বাপণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ও জনবল না থাকায় বারবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে।
এতে আর্থিকভাবে বড় ক্ষতির শিকার হচ্ছেন তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত দুই দশকে বেনাপোল স্থলবন্দরে নয়বার বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
সর্বশেষ ৭ জুন সন্ধ্যা ৭টায় বন্দরের ৩৫ নম্বর পণ্যাগারের সামনের মহাসড়কে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ট্রাকে আগুন লেগে যায়।
এতে ব্লিচিং পাউডারবাহী ভারতীয় ট্রাকটি সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়।
পরে ১ ঘণ্টা চেষ্টা করে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বেনাপোল স্থলবন্দরে বারবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ দেয়া হয়েছে।
কিন্তু নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারে টনক নড়েনি বন্দর কর্তৃপক্ষের।
এমনকি বন্দরের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ দেয়া হয়নি।
এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন তারা।
এদিকে সর্বশেষ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এ কমিটি অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও ক্ষতির পরিমাণ জানাবে।
বেনাপোল বন্দরের সহকারী পরিচালক মেহেদী হাসানকে প্রধান করে এ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
বন্দর সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৬ সালে বন্দরের ১০ নম্বরসহ ১০টি পণ্যাগারে আগুনে পুড়ে ক্ষতি হয় ৩০০ কোটি টাকার পণ্য।
২০০১ সালে ২৬ নম্বর পণ্যাগারে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতি হয় ৩০ কোটি, ২০০৫ সালে ১০ ও ৩৫ নম্বর পণ্যাগারে আগুনে ক্ষতি হয় ৭০ কোটি, ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারিতে ৩৫ নম্বর পণ্যাগারে আগুনে ক্ষতি হয় প্রায় ৫০০ কোটি, একই বছরের ২২ জুন ২৭ নম্বর পণ্যাগারে আগুনে ক্ষতি হয় ১৫০ কোটি ও ২০১৬ সালে ২ অক্টোবরে ২৩ নম্বর পণ্যাগারে আগুনে পুড়ে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় আনুমানিক ৫০০ কোটি টাকা।
এছাড়া ২০১৮ সালের ৬ জুন বন্দরের ২৫ নম্বর শেডে আগুন ধরে এক ট্রাকের পণ্য নষ্ট হয়।
ভারতীয় ট্রাক টার্মিনালে এ আগুনের ঘটনায় প্রায় ১০ কোটি টাকার পণ্য পুড়ে যায়।
২০১৯ সালের ২৭ আগস্ট বন্দরের ৩৫ নম্বর শেডে অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ৫০ কোটি টাকার পণ্য পুড়ে যায়।
সর্বশেষ ৭ জুন বেনাপোল বন্দরের ৩৫ নম্বর পণ্যাগারের ব্লিচিং পাউডারবাহী ট্রাকে আগুন লাগার ঘটনা ঘটল।
এতে প্রায় ৫০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এছাড়া ছোটখাটো আরো পাঁচ-ছয়টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে এ সময়ে।
বেনাপোল বন্দরের আমদানি-রফতানি সমিতির সহসভাপতি আমিনুল হক জানান, বন্দরের আমদানি পণ্যের ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার টন।
কিন্তু সেখানে সবসময় পণ্য থাকে প্রায় দেড় লাখ টন।
বন্দরে জায়গা সংকটে অনেক সময় সাধারণ পণ্যাগারে কেমিক্যাল পণ্য রাখা হয়।
এতেই আগুনের ঘটনা বেশি ঘটে থাকে।
আর যখন আগুন ধরে তখন বন্দরের পর্যাপ্ত জনবল ও সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় নেভানোর আগেই সব পুড়ে শেষ হয়ে যায়।
তিনি জানান, তিন বছর আগে বেনাপোল বন্দরের ২৩ নম্বর পণ্য গুদামে তার আমদানীকৃত প্রায় ২৫ লাখ টাকা মূল্যের পণ্য আগুনে পুড়ে ছাই হয়।
এতে তার পথে বসার উপক্রম হয়েছে।
ক্ষতিপূরণের আবেদন করলেও এখনো কিছু পাননি।
জানা গেছে, বর্তমানে বন্দরে আমদানি পণ্য রক্ষণাবেক্ষণে ৪৪টি পণ্যাগার, চারটি ওপেন ইয়ার্ড, একটি রফতানি টার্মিনাল, একটি ভারতীয় ট্রাক টার্মিনাল ও একটি আমদানীকৃত গাড়ির চেচিস রাখার টার্মিনাল রয়েছে।
যেখানে ১৬৩ জন আনসার সদস্য, বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মী পিমার ১০৩ জন ও এপিবিএনের ২০ সদস্য আমদানি পণ্যের রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তায় কাজ করছে।
তবে প্রয়োজনের তুলনায় এ জনবল অনেক কম।
স্থানীয় আমদানিকারক ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর হোসেনের অভিযোগ, পণ্যাগারে জায়গার অভাবে খোলা আকাশের নিচে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রাখা হচ্ছে মূল্যবান আমদানি পণ্য।
এতে প্রায়ই পণ্য চুরি হচ্ছে।
প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের আগে বন্দরের পণ্যাগার থেকে চুরি বেড়ে যায়।
আর যখন চুরির পরিমাণ বেড়ে যায় তখন বাঁচতে বন্দরের স্টোরকিপাররা ইচ্ছা করেই পণ্যগুদামে আগুন ধরিয়ে দেন।
পরে প্রচার করে বিদ্যুতের শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লেগেছে।
ধামাচাপা পড়ে যায় চুরির ঘটনা।
বেনাপোল বন্দরের ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা শাহিনুর রহমান জানান, এত বড় স্থলবন্দরে মাত্র চারজন নিয়ে তাকে কাজ করতে হচ্ছে।
এতে দুর্ঘটনা ঘটলে আগুন নেভাতে বিলম্ব হয়।
বিষয়টি বন্দর কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার জানানো হয়েছে।
তবে এখন পর্যন্ত জনবল নিয়োগ হয়নি।
বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে যশোর, মণিরামপুর ও ভারতের পেট্রাপোল বন্দরের ফায়ার সার্ভিসের সহযোগিতা নিয়ে বন্দরের আগুন নেভাতে হয়।
এ বিষয়ে বেনাপোল বন্দরের উপপরিচালক (ট্রাফিক) মামুন কবীর তরফদার জানান, বন্দরে ফায়ার সার্ভিস অফিসে প্রয়োজনীয় জনবল বাড়ানোর বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
আগে বন্দরে জায়গা সংকটের কারণে নির্দিষ্ট পণ্যাগারে পণ্য নামানোর ক্ষেত্রে কিছুটা অনিয়ম হতো।
তবে এখন নিয়ম মেনেই স্টোরকিপাররা পণ্য নামিয়ে থাকেন।
বন্দরে পণ্য চুরি একেবারে নেই বললেই চলে।
অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা যেন ক্ষতিপূরণ পান তার জন্য চেষ্টা করে থাকেন তিনি।
তবে নানা প্রতিবন্ধকতায় ক্ষতিপূরণ পাওয়া জটিল হয়ে দাঁড়ায়।










