বাংলাদেশে শীতের মাসগুলোয়, বিশেষ করে দেশের মধ্য ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ২০০১ সাল থেকে প্রায় প্রতি বছর নিপাহ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটে। বেশ কয়েক বছর ধরে কয়েকটি জেলায় এ ভাইরাসের উপস্থিতি দেখা গেছে। ২০০১ সালে প্রথম প্রাদুর্ভাবের সময় মৃত্যুহার ছিল ৬৯ শতাংশ, যা ২০২৩ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭১ দশমিক ৪ শতাংশে। ঢাকা বিভাগে নরসিংদী, রাজবাড়ী ও শরীয়তপুর জেলায় মোট ছয়জন রোগী শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। রাজশাহী বিভাগে নওগাঁ, নাটোর, পাবনা ও রাজশাহী জেলা থেকে চারজন রোগী শনাক্ত হয়েছে।

নিপাহ ভাইরাসের কারণে উচ্চ মৃত্যু, মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের সম্ভাবনা এবং ভ্যাকসিনের দুষ্প্রাপ্যতার কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) নিপাহকে মহামারী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ১৯৯৮ থেকে ১৯৯৯ সালে মালয়েশিয়ার শূকর পালনকারীদের মধ্যে নিপাহ প্রথম শনাক্ত হয় এবং তখন ভাইরাসটি শূকর থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে ২০০১ সালে বাংলাদেশ ও ভারতেও নিপাহ শনাক্ত করা হয়, যা বাদুড় থেকে নির্গত তরল দিয়ে সংক্রামিত হয়। বাংলাদেশে নিপাহ বাদুড়ের মলমূত্র থেকে কাঁচা বা গাঁজানো খেজুরের রস দিয়ে সংক্রামিত হয় বলে মনে করা হয়, যা মানুষকে আক্রান্ত করে। এ ভাইরাস লালা, প্রস্রাব ও মলের মতো শারীরিক তরলের মাধ্যমে এক মানুষ থেকে অন্য মানুষের মধ্যে ছড়াতে পারে। প্রাণীদের সংস্পর্শেও এর সংক্রমণ হতে পারে।

এ কারণে একদিকে যেখানে বাদুড় বাস করে সেসব গাছের ফল পরীক্ষা করে এবং ধুয়ে খাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। অন্যদিকে খেজুরের রস (বাঁশের স্কার্ট পদ্ধতি) সংগ্রহের জন্য ব্যবহৃত স্থান এবং পাত্রগুলো বাদুড়ের সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখার পদ্ধতিগুলো প্রয়োগ করার পরামর্শ রয়েছে। অনেকদিন থেকে তাজা রসের ব্যবহার বাদ দেয়ার প্রক্রিয়া কার্যকর করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু এ অভ্যাসগুলো নতুন এবং রস সংগ্রহের প্রচলিত কিছু পদ্ধতি রয়েছে বিধায় এ বিষয়গুলো দ্রুত কার্যকর করা সহজ নয়। 

সাধারণত ভাইরাসটির সংক্রমণের লক্ষণ ৪-১৪ দিন পর দেখা যায়, যেমন জ্বর, মাথাব্যথা, গলাব্যথা, বমি ইত্যাদি। ফুসফুসে সংক্রমণে কাশি ও শ্বাসকষ্ট হয়। স্নায়বিক সংক্রমণে এনসেফালাইটিস, মাথা ঘোরা, তন্দ্রা ভাব, কোমা ইত্যাদি হতে পারে। নিপাহ ভাইরাসের চিকিৎসা বা ভ্যাকসিন না থাকার কারণে নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ কমাতে এবং সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে সচেতন হওয়া জরুরি। এ রোগে আক্রান্তদের প্রতিরোধমূলক যত্ন নেয়া উচিত। আমরা জানি, টিকা মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে প্রমাণিত। কিন্তু এখন পর্যন্ত নিপাহ ভাইরাসের কোনো টিকা আবিষ্কার না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানী এবং সংস্থাগুলোর এ বিষয়ে ফোকাস করা জারুরি।

নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকার জন্য কিছু নির্দেশিকা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। যেমন একজন সংক্রমিত ব্যক্তির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ কমানো, সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে হাত ধোয়া, ৭০ শতাংশ ইথানল দিয়ে জীবাণুমুক্ত করা, গ্লাভস এবং অন্যান্য সুরক্ষামূলক উপায় মেনে চলা উচিত। নিপাহ জীবদেহে প্রায় ৪৫ দিন থাকতে পারে, তাই রোগী বেঁচে গেলেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। যেকোনো মৃত ব্যক্তির সংস্পর্শে গেলে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। যেমন সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধোয়া গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে তাজা খেজুরের রসের প্রয়োজনীয়তা ও সংরক্ষণের গুরুত্ব সম্পর্কে জনগণের সচেতনতা জরুরি। সংক্রমণ প্রতিরোধে তাজা খেজুরের রসে বাদুড়ের উপস্থিতি মনে রাখা উচিত। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ সম্পর্কিত বিভিন্ন পরিষেবা পরিচালনা করে, যেমন সমস্যা পর্যবেক্ষণ, শনাক্তকরণ, ব্যবস্থাপনা গ্রহণ এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ঝুঁকি হ্রাসকরণ। নিপাহ ভাইরাস নিশ্চিতকরণের জন্য ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। এক্ষেত্রে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা বেশি প্রয়োজন। পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক থাকা এবং ভাইরাসের লক্ষণ দেখা গেলে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এরই মধ্যে ২০৩০ সালকে টার্গেট করে নিপাহ নির্মূলে কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। এ কৌশল বাস্তবায়নের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সদস্যদেশগুলোকে তার দেশের কার্যালয়ের মাধ্যমে নিপাহ সংক্রামণ এবং তার বিস্তারের ওপর নজরদারি, পরীক্ষাগারের ব্যবস্থা, প্রাদুর্ভাব নির্ণয়, স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি, চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আইপিসি সম্পর্কিত বিদ্যমান বৈশ্বিক এবং আঞ্চলিক নির্দেশিকা ও টুলকিটগুলো মেনে চলতে সহায়তা করবে। বাংলাদেশের উচিত এ কর্মপরিকল্পনা মাথায় রেখে অতিদ্রুত নিজস্ব কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা এবং ২০৩০ সালের মধ্যে নিপাহ সম্পূর্ণভাবে এ দেশ থেকে নির্মূল করা।

ডা. আরিফুল বাসার: সিনিয়র কনসালট্যান্ট, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, ঢাকা