অঘটন। কাতার বিশ্বকাপের শুরু থেকে এ শব্দটাই হয়তো সবচেয়ে বেশিবার উচ্চারিত হচ্ছে। হওয়াটাই স্বাভাবিক। মরুর বুকে বড় দলগুলোকে একের পর এক হারের লজ্জায় ডুবিয়েছে পরিসংখ্যানের খাতায় পিছিয়ে থাকা অখ্যাত দলগুলো। ২২তম আসরের প্রথম অঘটনের জন্ম দেয় সৌদি আরব। দুইবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন তারকা ঠাসা আর্জেন্টিনাকে ২-১ গোলে হারিয়ে। এরপর অঘটনের শিকার ব্রাজিল, স্পেন, ফ্রান্স, পর্তুগালসহ সব বড় দল। তবে বড়দের মধ্যে অঘটনের শিকার হয়ে কাতার আসর থেকে ছিটকে গেছে শুধুই জার্মানি। প্রতিপক্ষকে দুমড়েমুচড়ে দেয়ায় তাদের নামটাই হয়ে গেছে জার্মান মেশিন। কিন্তু গত দুই আসরে শৌর্য হারিয়েছে জার্মান মেশিন। রাশিয়া আসরের পর এবার কাতারেও গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় ঘটল তাদের।

বিশ্বকাপের আসরে জার্মানি মানেই ফেভারিট। অথচ তারাই কিনা পরপর দুই আসরে প্রথম পর্ব থেকে বিদায় নিল। নিজেদের প্রথম ম্যাচেই অখ্যাত জাপানের সঙ্গে হেরে বসে চারবারের বিশ্ব শিরোপাজয়ী দলটি। পরের ম্যাচে স্পেনের সঙ্গে ড্র। দুই যুগ পরে গ্রুপ পর্ব থেকে বেলজিয়ামের বিদায় নেয়ার দৃশ্য জার্মান শিবিরেও হয়তো কিছুটা শঙ্কা জাগিয়েছিল। ২ ডিসেম্বর সে আশঙ্কাই সত্যি হয়ে আসে ম্যানুয়েল ন্যুয়ারের দলের জন্য। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচটিতে কোস্টারিকার সঙ্গে ৪-২ গোলে জয়ের পরও গ্রুপ পর্ব পার হওয়া হলো না তাদের।

অবশ্য জার্মানির ভাগ্য এদিন নিজেদের হাতে ছিল না। জাপানের কাছে প্রথম ম্যাচে ২-১ গোলের হার এবং স্পেনের সঙ্গে ১-১ গোলের ড্র করার ম্যাচেই তাদের ভাগ্য কিছুটা লেখা হয়েছিল। শেষ ম্যাচে কোস্টারিকাকে হারালেও নিশ্চয়তা ছিল না। গ্রুপের অন্য ম্যাচে জাপান স্পেনকে হারালেই কপাল পুড়বে জার্মানদের। হলোও তেমনটাই। জার্মান ও স্পেনের মতো পরাশক্তিকে হারিয়ে গ্রুপ ‘ই’ থেকে ৬ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে শেষ ষোলোতে উঠে যায় জাপান। আর জার্মানির সমানসংখ্যক ৪ পয়েন্ট থাকলেও গোল ব্যবধানে এগিয়ে থাকার সুবাদে স্পেনও কোনোমতে শেষ ষোলোতে ওঠে।

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমগুলোর শিরোনাম—কাতার বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় অঘটনের শিকার জার্মানি। চারবারের সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা টানা দুই আসরে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিয়েছে। ৮০ বছরে যেটা কখনো হয়নি, সেটা গত আট বছরে দুবার হলো।

গ্যারি লিনেকার বলেছিলেন, ‘ফুটবল এমন একটা খেলা, যেখানে ২২ জন একটা বলের পেছনে দৌড়ায়, কিন্তু দিন শেষে জেতে জার্মানি।’ এ মন্তব্যটি একটা সময় ফুটবলপ্রেমীদের বিশ্বাসেই পরিণত হয়েছিল। কয়েক প্রজন্ম ধরে জার্মানিকে খুব কমই হারতে দেখা গেছে। কঠিন পরিস্থিতিতেও জয় ছিনিয়ে আনাটাকে অভ্যাসে পরিণত করেছিল জার্মানি।

সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিয়েলসেন গ্রেসনোটে কয়েকদিন আগে বিশ্বকাপ থেকে জার্মানির বিদায়ের শঙ্কা ৪১ শতাংশ বলে জানিয়েছিল। বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচেই জার্মানির রক্ষণভাগকে দুর্বল মনে হয়েছে। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে জাপানের বিপক্ষে সেটি প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। কোস্টারিকার বিপক্ষের ম্যাচটিতেও তা অব্যাহত ছিল।

বলার মতো নাম একটাই। ম্যানুয়েল ন্যুয়ার। গোলবারে অভিজ্ঞ ও বিশ্বের সেরা গোলকিপার তিনি। বারবার দলকে বিপদ থেকে বাঁচিয়েছেন। বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচেই ন্যুয়ারই ছিলেন জার্মান বাহিনীর ত্রাণকর্তা।

১৯৩৮ সালের পর ২০১৮ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্যায় থেকে ছিটকে গিয়েছিল জার্মানি। এবারো সেই ধারাবাহিকতা বজায় থাকল। ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপের পর এবার কাতার বিশ্বকাপেও নকআউট পর্বে জায়গা করে নিতে পারেনি তারা। পরপর দুই আসরে প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নিতে হলো।

বিশ্বকাপে জার্মানি শিরোপা জিতেছে ১৯৫৪, ১৯৭৪, ১৯৯০ ও ২০১৪ সালে। এছাড়া জার্মানরা চারবারের রানার্সআপ, চারবার তৃতীয় স্থান ও একবার চতুর্থ স্থান পেয়ে বিশ্বকাপের এলিট দলগুলোর মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে। তাদের চেয়ে বেশি শিরোপা জিতেছে শুধু ব্রাজিল (৫ বার)। এছাড়া ইতালি জিতেছে তাদের সমান চার শিরোপা।

এছাড়া ১৯৭২, ১৯৮০ ও ১৯৯৬ সালে তিনবার ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপও জিতেছে জার্মানি। কনফেডারেশনস কাপসহ আরো কত কত শিরোপা গেছে জার্মানিতে। বৈশ্বিক আসরের প্রকৃত ‘বড় দল’ যখন বিশ্বকাপ থেকে আগেভাগেই বিদায় নেয়াটা বড় অঘটনই। গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিয়ে মর্মাহত জার্মান তারকা টমাস মুলার বলেছেন, এটা চরম বিপর্যয়। শক্তিহীনতার অনুভূতি হচ্ছে।