ব্যক্তির চেয়ে দল বড়- রাজনীতির মাঠে এ স্লোগানের বেশ কাটতি থাকলেও প্রতিযোগিতামূলক খেলায় এসব মানুষ খায় না। বিশেষ করে বিশ্বকাপ আসরে এর কোনো মিনিমাম ভ্যালুও নেই। খেলার মাঠে ‘দলের চেয়ে ব্যক্তি বড়’ স্লোগান বরং বেশি মানানসই। কেননা এমন অনেক সমর্থক আছেন যারা একটি দলকে সমর্থন করেন শুধু তার প্রিয় খেলোয়াড়টি ওই দলে খেলেন বলেই। এ জন্যই ফুটবল বিশ্বকাপে শিরোপা জয়ের সম্ভাব্য দল নিয়ে যতটা না হইচই হয়, তারচেয়ে বেশি আলোচনা জমে তারকা খেলোয়াড়দের নিয়ে। পাগলা সমর্থক গড়ে ওঠে কোনো নির্দিষ্ট খেলোয়াড়ের সমর্থন করতে গিয়ে। যেমন লিওনেল মেসির কথাই ধরুন। মেসি যে দলে থাকে সমর্থকরাও তখন সে দলের হয়ে যান। যেদিকে মেসি থাকেন বিশ্ব মিডিয়ার আলোও যেন সেদিকে পড়ে। এভাবেই দলমত ছাড়িয়ে দলের চেয়ে ব্যক্তি বড় হয়ে ওঠেন কখনো কখনো।

কাতার বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনাল ম্যাচটি শুরুর আগে এমন আলোচনা এখন প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। কেননা আর্জেন্টিনা দলে যেমন আছেন লিওনেল মেসি তেমনি ক্রোয়েশিয়া দলে আছে লুকা মডরিচ। লুসাইল স্টেডিয়ামে আজ আর্জেন্টিনা ও ক্রোয়েশিয়ার ম্যাচের পাশাপাশি এ দুজন এমএল১০-এর লড়াই দেখার অপেক্ষায় বিশ্ব। ১৪ তারিখের প্রথম ঘণ্টায় অর্থ্যাৎ ১৩ তারিখ পেরুলেই ম্যাচটি শুরু হবে। ম্যাচ শেষে কারো মাঝে ফাইনালে ওঠার উচ্ছ্বাস, কারো মুখ বিদায়ের বেদনায় নীল হয়ে উঠবে। হারলেই ছাড়তে হবে এই মহাআসর, বিদায়! যেমনটা রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন, তোমাকে জিততে হবে মনে রেখ, কেননা ফেরার সকল পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ফেরার সুযোগ তাদের কার্যতই আর নেই। কেননা মেসি-মডরিচ উভয়ের জন্যই এটি ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ। শ্রেষ্ঠত্য প্রমাণের শেষ লড়াই, শেষ সুযোগ। অন্তত বয়স এমনটাই বলছে মেসির ৩৫, মডরিচের ৩৭।

মেসি ও মডরিচের প্রথম দেখা ২০০৬ সালে। সে দেখায় ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ৩-২ গোলে হেরেছিল আর্জেন্টিনা। আর্জেন্টিনার জার্সিতে প্রথম গোল পান ১৮ বছর বয়সী মেসি। ওই ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার জার্সিতে অভিষেক হয় ২০ বছর বয়সী মডরিচের।

মডরিচ ও মেসির ক্যারিয়ারে কিছু পরিসংখ্যান দেখা যাক। ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে হারে আর্জেন্টিনা, কিন্তু সেরা খেলোয়াড় হন মেসি। চার বছর পর রাশিয়া বিশ্বকাপের ফাইনালে হারে ক্রোয়েশিয়া, সেরা খেলোয়াড় হন মডরিচ। আবার চার বছর পর আজ রাতে কাতার সেমিফাইনালে আবারো মুখোমুখি সেই দুই প্রান্তের দুজন তারকা। বিশ্বকাপ আসরে নিজের নাম উজ্জল করে রাখার শেষ ‍সুযোগ পাবেন যেকোনো একজন। কে হবেন সে ভাগ্যবান? লাতিন আমেরিকান মেসি নাকি পূর্ব ইউরোপের চিরসবুজ মিডফিল্ডার মডরিচ। খেলার ধাঁচ আলাদা হলেও অর্জন ও অভিজ্ঞতায় কেউ কারো চেয়ে কম নন।

মাঠের এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে মডরিচকে দেখা যায় না। আক্রমণভাগ, রক্ষণে, গোল মেকিং কিংবা খেলা তৈরিতে মডরিচের জুড়ি নেই। এজন্য ক্রোয়েশিয়ার ফরোয়ার্ড পেতকোভিচ তো বলেই রেখেছেন, মডরিচের কাছে বল দেয়া নাকি ব্যাংকে টাকা রাখার চেয়েও নিরাপদ।

মেসির প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। নিঃসন্দেহে দিয়েগো ম্যারাডোনার পর আর্জেন্টিনা ফুটবলের মহাতারকা মেসি। ২০০৬ সাল থেকে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নে বিভোর হয়ে খেলে যাচ্ছেন। ২০১০ সালের ব্যর্থতার পরে ২০১৪ সালে ফাইনালেও ওঠা হলো; কিন্তু কাজের কাজটাই হলো না। ২০১৮ তেও এমবাপ্পে-মডরিচের মঞ্চে ব্যর্থ। এবার শেষ বার। মাঠে নামার আগে মেসির সতীর্থরা অবশ্য বলে রেখেছেন, মেসির জন্য জীবন দিয়ে দেব! আকাশি-সাদার প্রতিশ্রুতি নয়, শুধু মেসির জন্য শিরোপাটা জিততে চায় আর্জেন্টিনা দল।

আর্জেন্টিনা যেমন স্বপ্ন দেখছে মেসির কাঁধে ভর করে, ক্রোয়েশিয়া তেমনি মডরিচের। দুজনের জার্সি নাম্বার টেন, দলের মূল আকর্ষণ, প্রাণভোমরা। মেসিকে প্রায়ই ভিনগ্রহের খেলোয়াড় বলা হয়, মডরিচকে পৃথিবীর সেরা মিডফিল্ডার।

আজকের সেমিফাইনাল ম্যাচের আগে মডরিচ বলেছেন, ‘মেসি অনেক বড় মাপের খেলোয়াড়। তাকে থামানো কঠিন হবে। তবে আমরাও প্রস্তুত। মডরিচের কথায় বিনয় থাকলেও আজ মাঠে কোন ছাড় দেবেননা একরত্তি। লড়াইটা যতটা না আর্জেন্টিনা-ক্রোয়েশিয়ার থাকবে, তারচেয়েও বেশি ছাপ রাখবে ‘এলএম১০’ বনাম ‘এলএম১০’।

আর্জেন্টিনা মেসিনির্ভর হলেও ক্রোয়েশিয়া পুরোপুরি তেমনটি নয়। নির্দিষ্ট কোনো একজন খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভরশীল নয় তারা। এরপরও কাতার বিশ্বকাপে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন অধিনায়ক লুকা মডরিচ। আজ তার নেতৃত্বে ক্রোয়েশিয়া ভালো কিছু করবে এমনটাই আশা করছে সমর্থকরা।

২০১৮ বিশ্বকাপের রানার্সআপ স্মৃতি নিয়ে ক্রোয়েশিয়ান দল মেসিদের মুখোমুখি। আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন। অন্যদিকে ৩৬ বছরের শিরোপাবঞ্চিত আর্জেন্টাইনরা মেসির শেষ বিশ্বকাপ আসরে কাপটা যেকোনো ভাবে দখলে নিতে চায়। কে হাসবে শেষ হাসি, রাত ১টায় শুরু হওয়া ম্যাচে নির্ধারিত হয়ে যাবে।


ছবি: এপি